বাংলাদেশে চলতি নভেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে প্রবাসীরা প্রেরণ করেছেন মোট ২৩৪ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এ হিসাবে প্রতিদিন গড় রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৯ কোটি ৭৮ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী মঙ্গলবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হিসেবে চলতি বছরের নভেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গত ২৪ নভেম্বর একদিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং পরিবারের জীবনযাত্রা সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করছে। এ ধরনের প্রবাহ স্থানীয় বাজারে নগদ সরবরাহ বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করে।
জুলাই থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে দেশে এসেছে ১,২৪৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল কম, ফলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের বৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়। এই প্রবাহ ১৬ দশমিক ১০ শতাংশের উর্ধ্বগতি নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রেমিট্যান্স সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রবাসীরা মূলত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ প্রেরণ করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ সাধারণত পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ছোট ব্যবসার সহায়তায় ব্যবহার হয়।
আগের কয়েক মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যথাক্রমে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার এবং ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার দেশে এসেছে।
এছাড়া আগস্ট ও জুলাই মাসে যথাক্রমে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ও ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছিল। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, চলতি অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
এছাড়া, এটি বিভিন্ন ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে।
গত অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে দেশে প্রবাসীরা প্রেরণ করেছেন সর্বমোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বা ৩,৩২৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই রেকর্ড প্রাপ্তি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি হ্রাসে এবং অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রবাসী আয় শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিবারের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। এই অর্থ দেশের খুচরা বাজারে সঞ্চয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় প্রাপ্ত রেমিট্যান্স জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসী আয় দেশের মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, এটি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠাচ্ছেন না, তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থায়ী অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো অর্থের কারণে পরিবারগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করে।
এখনো চলতি নভেম্বর মাসের বাকি দিনগুলোতে আরও রেমিট্যান্স আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা আগামী মাসগুলিতেও অব্যাহত থাকবে, যা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন