জুলাই ঘটনার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি সজীব ওয়াজেদ জয়

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২৫, ০৮:৫৯ পিএম
জুলাই ঘটনার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি সজীব ওয়াজেদ জয়

জুলাই মাসের অস্থির সময়কার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতার ঘটনায় এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়াতে হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে। আন্দোলনের সময় ধারাবাহিকভাবে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট সূত্র।

প্রসিকিউশনের দাবি, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্তে ভূমিকা পালন করেন। এতে চলমান आंदोलन নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী ‘সহজ সুযোগ’ পায় এবং বহু নাগরিক নিহত হন বা নির্যাতনের শিকার হন এমন অভিযোগই তদন্তের কেন্দ্রে ছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের তিন সপ্তাহে অন্তত একাধিকবার হঠাৎ করে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। ১৭ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, একাধিক অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ১৩ দিন অচল ছিল, পুরোপুরি স্বাভাবিক হয় ৫ আগস্ট দুপুরে।

প্রসিকিউশনের দাবি, এই সময়সীমার মধ্যে সাইবার যোগাযোগ বন্ধ থাকায় আন্দোলনকারীরা সমন্বিতভাবে সংগঠিত হতে পারেননি এবং একইসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর জনসাধারণের কাছে পৌঁছায়নি। তাদের বক্তব্য, এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও কঠোর হয় এবং বহু প্রাণহানি ঘটে।

সজীব ওয়াজেদ জয় ছাড়াও একই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে। তদন্ত টিম বলছে, ইন্টারনেট বন্ধের নীতিগত অনুমোদনে দুজনেরই সম্পৃক্ততার প্রমাণ তারা সংগ্রহ করেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কারও ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।

ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত মামলার বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা প্রস্তুত করছে প্রসিকিউশন। সেখানে অভিযুক্ত হিসেবে আছেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কারফিউ জারি, চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে তাঁদের ‘নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা’ ছিল এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। 

তারা দাবি করেছে, আন্দোলন ‘দমন করতে বিশেষ পরামর্শ’ দেওয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক প্রাণহানির দিকে নিয়ে যায়। তবে এই অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে প্রসিকিউশন যে ধরনের সাক্ষ্য, নথি বা প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, সে সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনাল কিছু জানায়নি।

ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম শেষ হলে বৃহস্পতিবার অথবা আগামী সপ্তাহের মধ্যে দুটি মামলারই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে। এতে চারজন উচ্চপর্যায়ের সাবেক নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। তবে অভিযোগ গৃহীত হবে কি না সেটি সম্পূর্ণ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আইনজীবী মনে করছেন, দেশের ইতিহাসে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে তদন্ত সম্পন্ন হওয়া একটি ‘অস্বাভাবিক ও গুরুতর’ দৃষ্টান্ত।

একজন সিনিয়র আইনজীবীর মতে, ডিজিটাল অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করার অভিযোগ  এটা নতুন ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আদালত যদি বিচার গ্রহণ করে, তাহলে এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি-সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, আন্দোলনের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই অভিযোগের যথার্থতা আদালতে কতটা টিকে থাকবে, তা এখনই বলা কঠিন।

জুলাই মাসের ঘটনাকে ঘিরে চলমান এই তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়, জুনাইদ আহমেদ পলক, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান সবাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতি-নির্ধারণী অবস্থানের ব্যক্তিত্ব। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে টিকে গেলে দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে এমন মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকেরা।

এখন নজর সবার ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণ করবে কি না, এবং করলে বিচারিক প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়।

জেএইচআর