নতুন বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুখবর বয়ে আনছেন প্রবাসী কর্মীরা। ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহেই প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১৭০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী এর পরিমাণ ২০ হাজার ৭৭৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গতকাল বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমকে এ ইতিবাচক পরিসংখ্যানের বিস্তারিত জানিয়েছেন। তথ্যানুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে অর্থাৎ ১ থেকে ১৪ জানুয়ারির মধ্যে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৬৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল গত বুধবার ১৪ জানুয়ারি একদিনেই দেশে এসেছে ১ হাজার ৩৭৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। প্রতিদিন গড়ে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ আসার ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট কাটতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেবল জানুয়ারির শুরুতেই নয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের ধারা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।
তথ্যানুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয় এসেছে এক হাজার ৭৯৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। বিগত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসেই রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের স্থিতিশীলতা ও ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ সময়ের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ৩১৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয় বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। বর্তমানে প্রতি ডলারে ১২২ টাকা বা তার বেশি বিনিময় হার পাওয়ায় প্রবাসীরা বৈধ পথে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন বা হুন্ডি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কড়া নজরদারি রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক রেমিট্যান্সের ওপর সরকারি আড়াই শতাংশ প্রণোদনার পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে বাড়তি বোনাস প্রদান করছে, যা প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
রেমিট্যান্সের এ জোয়ারের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। আমদানির ব্যয় মেটানো এবং আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি সরকারকে স্বস্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া রেমিট্যান্সের অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে, যা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে সামনে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির এ প্রবণতা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় প্রবাসীদের বৈধ পথে আয় পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছে। যদি এ ধারা মাসজুড়ে অব্যাহত থাকে, তবে জানুয়ারি শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রেমিট্যান্সের গতি বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে যে অস্থিরতা ছিল তা অনেকটা প্রশমিত হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে সহজে আমদানিকারকদের ঋণপত্র খোলার সুযোগ পাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। রেমিট্যান্সের এ ধারা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন