একনেকে একগুচ্ছ বড় সিদ্ধান্ত

ডলারের উত্তাপে রূপপুরের ব্যয় বাড়ছে ২৬ হাজার কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
ডলারের উত্তাপে রূপপুরের ব্যয় বাড়ছে ২৬ হাজার কোটি টাকা

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ টাকার অঙ্কে বিশাল ব্যবধানে বেড়ে গেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের ফলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অতিরিক্ত ২৫ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা যোগ হচ্ছে। 

তবে প্রকল্পের মোট খরচ ডলারের হিসাবে অপরিবর্তিত থাকলেও দেশীয় মুদ্রায় এই বৃদ্ধি প্রকল্পের মোট আকারকে নিয়ে গেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়। 

রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

নির্বাচনের আগে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেক সভা হতে পারে এটি, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে যখন রূপপুর প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার সাথে ঋণচুক্তি হয়, তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল মাত্র ৮০ টাকা। বর্তমানে সেই ডলারের বাজার দর ১২২ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে ডলারপ্রতি খরচ বেড়েছে ৪২ টাকা। রাশিয়া এই প্রকল্পে ১১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। ডলারের দাম বাড়ায় রাশিয়ার ঋণের অংশ টাকার হিসাবে এখন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। যদিও রুশ মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান স্থিতিশীল থাকায় মূল বৈদেশিক ঋণের পরিমাণে কোনো হেরফের হয়নি। 

অন্যদিকে, ব্যয় সাশ্রয় নীতির কারণে দেশীয় উৎসের খরচ ১৬৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড মহামারি, বৈশ্বিক ভূ রাজনীতি এবং রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখন প্রকল্পটির সময়সীমা ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, রাশিয়ার আগ্রহেই মূলত এই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

একনেক সভা শেষে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথা জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী জুন বা ডিসেম্বরের মধ্যে যে প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার কথা, তা যদি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হয়, তবে সেই সব প্রকল্পের অর্থছাড় স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে শিগগিরই সব মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 

এদিনের সভায় নীলফামারীতে একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্পও পাস হয়েছে। এই হাসপাতালটি সম্পর্কে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, এটি এমন মানের হবে যে কেবল স্থানীয়রাই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশের অর্থাৎ ভারতের সীমান্তের ওপার থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসবেন। কারণ সীমান্তবর্তী ওই অঞ্চলগুলোতে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আজকের সভার গুরুত্ব ছিল ভিন্নতর। সভায় ২৫টি বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ হাজার ১৮ কোটি টাকাই আসবে বিদেশি ঋণ ও সহায়তা থেকে। উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ইঙ্গিত দেন যে, নির্বাচনের আগে এটাই হতে পারে শেষ একনেক সভা। 

তিনি বলেন, সাধারণত রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প পাস করে, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই পথে হাঁটছে না। জাতীয় প্রয়োজনে বিশেষ প্রয়োজন না হলে আর কোনো সভা আয়োজন সমীচীন হবে কি না, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বৃদ্ধি মূলত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতারই প্রতিফলন। 

ডলারের দামের আকাশচুম্বী বৃদ্ধি মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, রূপপুর তার অন্যতম উদাহরণ। তবে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে এবং বর্ধিত বাজেটের মধ্যে এই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ইএইচ