দেশের ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে অর্থনীতি। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের দাবি তুলেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যেখানে ঋণখেলাপিদের ওপর সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি এবং তাদের নাগরিক সুবিধা সংকোচনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ঋণখেলাপিদের নাম-ছবি প্রকাশ এবং তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এবিবির প্রস্তাবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো খেলাপিদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। সংগঠনটি দাবি করেছে:
বিদেশযাত্রায় কড়াকড়ি: আদালতের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো চিহ্নিত ঋণখেলাপি যেন দেশের বাইরে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকাশ্যে নাম-ছবি: ব্যাংকগুলোকে তাদের খেলাপি গ্রাহকদের নাম এবং ছবি জনসমক্ষে প্রকাশের আইনি অনুমোদন দিতে হবে, যাতে সামাজিকভাবে তাদের ওপর চাপ তৈরি হয়।
ব্যবসায়ী নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞা: কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি যাতে এফবিসিসিআই বা বিজিএমইএ-র মতো কোনো বাণিজ্যিক সংগঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সেই আইনি সংস্কার প্রয়োজন।
এবিবি তাদের প্রস্তাবনাগুলোকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করেছে। নিচে সেগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
ব্যাংকগুলো চায় কেবল কাগজ-কলমে নয়, পকেট থেকে টাকা বের করে আনুক খেলাপিরা। এজন্য বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ও ছবি প্রকাশের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যপদে অযোগ্য ঘোষণার দাবি তোলা হয়েছে।
ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে রাখা জমি বা সম্পদ নিলামে তুলতে গিয়ে নানা বাধার সম্মুখীন হয়। এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী:
নিলামে কেনা সম্পত্তির আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করে ক্রেতাদের উৎসাহিত করতে হবে।
জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা বাতিল করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের স্বয়ংক্রিয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
মালিকের অনুপস্থিতিতেই ব্যাংক যেন জমির খাজনা বা জরিপ সম্পন্ন করতে পারে, সেই ক্ষমতা দিতে হবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় আইনি ফাঁকফোকর গলিয়ে বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়। এবিবি দাবি করেছে:
উচ্চ আদালতে রিট বা স্টে-অর্ডার নেওয়ার আগে মোট ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (ডাউনপেমেন্ট) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সিআইবি রিপোর্টের বিরুদ্ধে ঢালাও স্টে-অর্ডার বন্ধ করতে হবে।
খেলাপিদের দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ বর্তমানের ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর পর্যন্ত করতে হবে।
ভবিষ্যতে যাতে ভুয়া সম্পদ দেখিয়ে কেউ ঋণ নিতে না পারে, সেজন্য ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারীদের একটি কেন্দ্রীয় তালিকা প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া সিআইবির মতো ব্যক্তিগত সম্পদের একটি শক্তিশালী ডেটাবেজ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে এবিবি।
ব্যাংকারদের এই অনড় অবস্থানের পেছনে রয়েছে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ব্যাংক খাতের মোট বিতরিত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশই এখন খেলাপি। অংকে যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরে খেলাপি ঋণের যে তথ্য গোপন করা হয়েছিল, তা এখন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ব্যাংকারদের আশঙ্কা, সঠিকভাবে হিসাব করলে এই হার অদূর ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ফলে নগদ টাকার তীব্র সংকট এবং তারল্য ঘাটতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার অস্তিত্ব টেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কঠোরতার পাশাপাশি এবিবি কিছু ক্ষেত্রে নমনীয়তার প্রস্তাবও দিয়েছে। মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মালিকদের ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ এবং দ্রুত ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আংশিক অবলোপন (Write-off) সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
এবিবির এই প্রস্তাবনাগুলো যদি সরকার বাস্তবায়ন করে, তবে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনি কাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও বড় শিল্পগোষ্ঠীর ওপর এই আইন সমানভাবে প্রয়োগ করাটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল ছোট বা মাঝারি খেলাপিদের ওপর খড়গ হস্ত না হয়ে যদি বড় খেলাপিদের বিদেশযাত্রা বন্ধ করা যায়, তবেই ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরে আসা সম্ভব।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন