ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: কঠোর ও মানবিক ব্যাংকিংয়ের নতুন রোডম্যাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: কঠোর ও মানবিক ব্যাংকিংয়ের নতুন রোডম্যাপ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে ব্যাংকগুলোকে আরও দৃঢ় ও আপসহীন হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যেমন বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো অনাদায়ী অর্থ পুনরুদ্ধারে অকুতোভয় ভূমিকা রাখা।

সোমবার সকালে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (ICCB) আয়োজিত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও পেশাদারিত্ব ধরে রাখার জন্য ব্যাংকারদের প্রতি আহ্বান জানান।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, "ঋণ দেওয়ার সময় গ্রাহকের পরিশোধ করার ক্ষমতা আছে কি না, তা সঠিকভাবে যাচাই না করলে দিনশেষে ব্যাংকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এখন সময় এসেছে পাওনা আদায়ে কঠোর হওয়ার। ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে সাহসী হতে হবে, কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে নতি স্বীকার করা চলবে না।"

সক্ষমতা যাচাই: ঋণ বিতরণের আগে গ্রাহকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও পূর্বের ট্র্যাক রেকর্ড কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

 সাহসী ব্যাংকিং: প্রভাবশালী খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে আইনি ও প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপে দ্বিধা করা যাবে না।

বৈদেশিক খাত মজবুত করা: রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোক্তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে হবে।

এসএমই খাতে গুরুত্ব: ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় কর্পোরেট হাউসের পেছনে ছুটতে পছন্দ করে। গভর্নর এই প্রবণতা কমিয়ে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) শিল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর তাগিদ দেন। তাঁর মতে, উৎপাদনশীল খাতে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, "রাজনৈতিক সরকারের অধীনে কাজ করা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে, কিন্তু পেশাদার ব্যাংকার হিসেবে আপনাদের নিয়মনীতি মেনেই চলতে হবে।"

অসম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার যে ভিত তৈরি করে দিয়েছে, তা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব এখন পেশাদার ব্যাংকারদের।

বিঘ্ন মোকাবিলা: আগামীতে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক বাঁধা আসতে পারে, সেগুলোকে পেশাদারিত্ব দিয়ে জয় করার মানসিকতা রাখতে হবে।

মানুষের সেবা: ব্যাংকিং কেবল মুনাফা অর্জনের জায়গা নয়, এটি একটি সেবামূলক খাত। নিয়ম মেনে মানুষের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

কর্মসংস্থান ও এসএমই: উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের বেকারত্ব দূর করতে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পই প্রধান শক্তি। তাই বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে মনোযোগী হতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংকের ওপর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। সম্মেলনে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত বছরের অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা এবং আগামী বছরের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। গভর্নর সোনালী ব্যাংকের প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকসেবার মান আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
 
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর অবস্থান অনিবার্য ছিল। গভর্নর ও উপদেষ্টার এই যুগপৎ আহ্বান ব্যাংকারদের মনোবল বৃদ্ধি করবে এবং ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা গেলে বাজারে তারল্য সংকট অনেকাংশেই দূর হবে।

২০২৬ সালের এই সম্মেলনটি ব্যাংক খাতের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। ঋণ আদায়ে সাহসিকতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এএন