দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির অভিশাপ যেন পিছু ছাড়ছেই না। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জানুয়ারিতেও বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আজ রোববারের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। টানা তিন মাসের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করছে যে, বাজার নিয়ন্ত্রণের বর্তমান কৌশলগুলো খুব একটা কাজে আসছে না।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাসওয়ারি হিসেবে পণ্য ও সেবার দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
জানুয়ারির এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেরই বড় ভূমিকা রয়েছে। টানা চার মাস ধরে বেড়েই চলেছে খাবারের দাম। জানুয়ারিতে এটি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি প্রতিটি খাতের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং পোশাক-আশাকের মতো খাতে খরচ বেড়েছে আরও বেশি। জানুয়ারিতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতিকে অনেক অর্থনীতিবিদ 'অদৃশ্য কর' হিসেবে অভিহিত করেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রার মানে। যদি আপনার আয় একই থাকে কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, তবে আপনার প্রকৃত আয় কমে যায়।
বিবিএস বলছে, জানুয়ারিতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অন্যদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ, মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে খরচ। এর ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভাঙছে অথবা ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছে। বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে চাকরি করেন বা দিনমজুর, তাদের জীবনযাপন এখন কাটছাঁটের বৃত্তে বন্দি।
মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ হওয়ার মানে কী? সাধারণ একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যে পরিমাণ বাজার করতে আপনার খরচ হতো ১০০ টাকা, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেই একই পরিমাণ বাজার করতে এখন আপনার খরচ হচ্ছে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় আপনার পকেট থেকে অতিরিক্ত ৮ টাকা ৫৮ পয়সা বেরিয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচ মেটানো এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হবে এই ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশের মূল্যস্ফীতি। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে (২০২৫ সালে গড় ছিল ৮.৭৭%)। নতুন নীতিনির্ধারকদের জন্য এই হার কমিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে এক নম্বর অগ্রাধিকার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মুদ্রানীতির কঠোর প্রয়োগ। বাজারে টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা, নিত্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে সরবরাহ বাড়ানো ও ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের পণ্য বাজারে আনা।
মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন দৌড় সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতের স্বপ্নকে ফিকে করে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বাজারের থলে যখন আধা-খালি হয়ে বাড়ি ফেরে, তখন সেই যাতনা কেবল সাধারণ মানুষই বোঝে। আগামীর সরকারের জন্য এটিই হবে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ কীভাবে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়িয়ে বাজারের আগুনের উত্তাপ কমিয়ে আনা যায়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন