চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় আধা-বছরের (জানুয়ারি-জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই মুদ্রানীতিতে প্রধান ‘নীতি সুদের হার’ (Policy Rate) কোনো পরিবর্তন না করে আগের মতোই ১০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।
সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই ঘোষণা দেন।
মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে এবং বাজারে টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সংকোচনমূলক (Contractionary) অবস্থান বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অলস টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেলে না রেখে বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিলে ১০ শতাংশ সুদ দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর টাকা জমা রাখার সুদ বা ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি’ (SDF) হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা জমা রেখে আগের চেয়ে কম লাভ পাবে, যা তাদের বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে উৎসাহিত করবে। তাছাড়া, স্থায়ী ঋণ সুবিধা বা 'স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি' হার ১১.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
গভর্নর স্বীকার করেন যে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার (৭ শতাংশ) চেয়ে বেশি রয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে আছি। এখনই নীতি সুদহার কমানো হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। তাই আমরা আপাতত সুদহার কমানোর ঝুঁকি নেব না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত এক বছরে বাজার থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে বলে জানান গভর্নর। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করা হয়নি, বরং বাজার থেকে কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করা হয়েছে। বর্তমানে আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী আমাদের হাতে পর্যাপ্ত নেট রিজার্ভ রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার সংকটের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে। তবে সরকার বাজেটে ব্যয় সংকোচন করার পরেও ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি উদ্বেগের বিষয়।
গভর্নর জানান, ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। তবে এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক সম্পদ শ্রেণিবিন্যাসের ফল। তিনি বলেন, আমরা প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখতে চাই না। সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ও ডিপোজিট সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কার্যকর করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুদ্রানীতির ফলে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি কিছু প্রভাব পড়বে। নীতি সুদহার বেশি থাকায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার এখনই কমছে না। ফলে শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণের খরচ বেশিই থাকবে। আমানত বিমা সুবিধা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করায় সাধারণ আমানতকারীদের ঝুঁকি কমেছে। এসডিএফ হার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত টাকা ব্যবসায়ীদের ঋণ হিসেবে দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে, যা বাজারে তারল্য সংকট কাটাতে সাহায্য করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রানীতির মাধ্যমে একটি 'সতর্ক ভারসাম্য' বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনমূলক নীতি রাখা হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে বাধ্য করার জন্য জমা রাখার সুদের হার কমানো হয়েছে। তবে আসন্ন রমজান মাস এবং নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে বাজারে চাহিদার যে চাপ তৈরি হবে, তা সামলানোই হবে এই মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন