ইসলামী ব্যাংকের বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন: ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার আস্থার শিখরে

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
ইসলামী ব্যাংকের বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তন: ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার আস্থার শিখরে

সংকটের সেই অন্ধকার দিনগুলো: যখন অস্তিত্ব ছিল বিপন্ন
২০২৪ সালের আগস্টের আগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ছিল এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক লুটেরার কবলে। এস আলম গ্রুপ কর্তৃক দীর্ঘ সাত বছরের অনৈতিক দখলদারিত্বে ব্যাংকটি তার চার দশকের গৌরব হারিয়ে ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। বেনামি ঋণ, কাগুজে কোম্পানিকে হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন এবং সুশাসনের অভাবে সাধারণ মানুষ জীবনভর জমানো টাকা এই ব্যাংক থেকে তুলে নিতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ ছিল যে, ২,০০০ কোটি টাকার সিআরআর (CRR) ঘাটতি নিয়ে ব্যাংকটি কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তা ছাড়া একদিনও চলার ক্ষমতা ছিল না এই বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।

২. বোর্ড সংস্কার ও আস্থার পুনর্জন্ম: নেতৃত্বের পরিবর্তন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক এক ঐতিহাসিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। এস আলম গ্রুপের মনোনীত পর্ষদ ভেঙে দিয়ে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সৎ, স্বচ্ছ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। এই একটি পদক্ষেপই ২০২৬ সালের আজকের স্থিতিশীল অবস্থানে আসার প্রধান চাবিকাঠি। এস আলম সংশ্লিষ্ট ৮২ শতাংশ শেয়ার জব্দ করার মাধ্যমে ব্যাংকটি আবার সাধারণ মানুষের ব্যাংকে পরিণত হয়। নতুন বোর্ড দায়িত্ব নিয়েই প্রতিটি শাখায় গিয়ে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে এবং ব্যাংকটিকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখার ঘোষণা দেয়।

৩. আমানত ও রেমিট্যান্সের জোয়ার: বিশ্ব রেকর্ডের পদধ্বনি
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসে ইসলামী ব্যাংকে নিট আমানত বেড়েছে প্রায় ১৯,০০০ কোটি টাকা। এটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, দক্ষিণ এশীয় ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এক বিস্ময়কর অর্জন।

  • আমানত প্রবৃদ্ধি: ২০২৬ সালের এই ফেব্রুয়ারিতে এসে দেখা যাচ্ছে, যারা এক সময় আতঙ্কে টাকা তুলে নিয়েছিলেন, তারা এখন দ্বিগুণ উৎসাহে আবার ইসলামী ব্যাংকে ফিরছেন। বিশেষ করে ফিক্সড ডিপোজিট এবং সেভিংস অ্যাকাউন্টে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ৩০% বেশি।
  • রেমিট্যান্সের একক আধিপত্য: প্রবাসীদের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে ব্যাংকটি। বর্তমানে বাংলাদেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের একটি সিংহভাগই আসছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে, যা গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ডলার সংকটের সময়ে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।

৪. তারল্য সংকট থেকে মুক্তি: স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত
এক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হাত পাতা ইসলামী ব্যাংক এখন সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। ব্যাংকটি তার সিআরআর এবং এসএলআর (SLR) ঘাটতি সফলভাবে পূরণ করেছে। বর্তমানে ব্যাংকটি আর কোনো সংকটের মুখে নেই, বরং উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে বিনিয়োগের নতুন ও নিরাপদ ক্ষেত্র খুঁজছে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারেও (Call Money Market) ইসলামী ব্যাংক এখন দাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করছে, যা দেড় বছর আগেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল।

৫. বর্তমান চিত্র: এসএমই এবং তৃণমূল অর্থনীতির ক্ষমতায়ন
২০২৬ সালের শুরুতে ইসলামী ব্যাংক তার বিনিয়োগ কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বড় কোনো কর্পোরেট হাউজকে এককভাবে বিশাল ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে ব্যাংকটি এখন ‘পল্লি উন্নয়ন প্রকল্প’ (RDS) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে মনোযোগ দিচ্ছে।

  • তৃণমূল ব্যাংকিং: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং ছোট উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যাংকটি নতুন একগুচ্ছ স্কিম চালু করেছে।
  • ডিজিটাল রূপান্তর: ২০২৬ সালে এসে ব্যাংকটির মোবাইল অ্যাপ 'CellFin' এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। ফলে এখন ৫ কোটিরও বেশি গ্রাহক শাখা ছাড়াই ঘরে বসে অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন।

৬. মূলধন ও প্রভিশন চ্যালেঞ্জ: আগামীর দীর্ঘ পথ
আমানত ফিরলেও অতীতের সাত বছরের ক্ষত মোচন করা রাতারাতি সম্ভব ছিল না। এস আলম জমানার গোপন করা ৮৬,০০০ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা এখনও ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে বড় ক্ষত হয়ে আছে।

  • মূলধন পরিস্থিতি: বর্তমানে ব্যাংকের সিআরএআর (CRAR) বা মূলধন পর্যাপ্ততার হার ৭ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী এটি এখনও ঘাটতির পর্যায়ে।
  • সমাধান প্রক্রিয়া: জব্দকৃত ৮২ শতাংশ শেয়ার আদালতের আদেশে নতুন এবং স্বচ্ছ কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের (Strategic Investors) কাছে বিক্রির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ব্যাংকটি তার সব আর্থিক সূচকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাবে এবং পুনরায় লভ্যাংশ প্রদানে রেকর্ড করবে।’

৭. ২০২৬-এ ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা (এক নজরে)

সূচক- বর্তমান অবস্থা (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), প্রভাব পরিচালনা পর্ষদ, এস আলম মুক্ত ও পেশাদার বোর্ড, সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত, আমানত প্রবাহ, ১৯০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি (১ বছরে), তারল্য সংকট পুরোপুরি নিরসন, রেমিট্যান্স, দেশের মোট প্রবাহের ৩৩% (প্রায়), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বর্তমান কৌশল, রিটেইল কৃষি ও এসএমই ব্যাংকিং, ঝুঁকি হ্রাস ও টেকসই প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল ইউজার, ৫ কোটি প্লাস (CellFin ও ইন্টারনেট), আধুনিক ব্যাংকিং সেবা দোরগোড়ায়।

এস আলম মুক্ত হওয়ার ১৮ মাসে আমানত ও রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড; ২০২৬-এর আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পথে অগ্রযাত্রা।

শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ের জয়গান
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র এই অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানো নয়, এটি বাংলাদেশের শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং দর্শনের নৈতিক জয়। যারা ষড়যন্ত্র করে ভেবেছিলেন এই ব্যাংকটি ধ্বংস হয়ে যাবে, ২০২৬ সালের এই পরিসংখ্যান তাদের জন্য এক কড়া জবাব।

গ্রাহকদের অকৃত্রিম ভালোবাসা, কর্মীদের সততা এবং নতুন বোর্ডের নিরপেক্ষ অবস্থান ইসলামী ব্যাংককে আবার এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে নিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই ব্যাংক এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

জেএইচআর