ডিজিটাল ফিন্যান্সে শরিয়াহ বিপ্লব: বিকাশে ঢাকা ব্যাংকের ‘ইসলামিক ডিপিএস’

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
ডিজিটাল ফিন্যান্সে শরিয়াহ বিপ্লব: বিকাশে ঢাকা ব্যাংকের ‘ইসলামিক ডিপিএস’

বাংলাদেশের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (DFS) খাতে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে দেশের বৃহত্তম মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়াতে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে ঢাকা ব্যাংকের সাথে যৌথভাবে তারা চালু করেছে ‘ইসলামিক ডিপিএস’ বা মুদারাবা সেভিংস স্কিম।

এই প্রযুক্তিবান্ধব ক্ষুদ্র সঞ্চয় পদ্ধতিটি ইতিমধ্যেই সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে যারা ব্যাংকিং জটিলতা এড়িয়ে শরিয়াহ মোতাবেক মুনাফা অর্জন করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ সমাধান।

আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কেন এই সেবাটি অনন্য, কীভাবে এটি কাজ করে এবং একজন সাধারণ গ্রাহক কীভাবে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই তার স্মার্টফোন ব্যবহার করে এই সঞ্চয় শুরু করতে পারেন।

ঐতিহ্যগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট খোলা মানেই ছিল একরাশ কাগজের স্তূপ, ছবি সত্যায়ন এবং সশরীরে ব্যাংকে উপস্থিত হওয়া। কিন্তু বিকাশের এই প্ল্যাটফর্মে সেই প্রথাগত ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এর প্রধান কিছু গুরুত্ব হলো-

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: গ্রামের প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে শহরের ছোট ব্যবসায়ী—সবাই এখন ২৫০ টাকার মতো ক্ষুদ্র কিস্তিতে সঞ্চয় করতে পারছেন।

শরিয়াহ সম্মত মুনাফা: সুদভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে যারা ‘লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি’র ভিত্তিতে অর্থ জমাতে চান, তাদের জন্য এটি নিরাপদ মাধ্যম।

ক্যাশলেস সোসাইটি: পকেটে নগদ টাকা না থাকলেও বিকাশ ব্যালেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঞ্চয় হওয়ার ফলে টাকা খরচে নিয়ন্ত্রণ আসে।

সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই সুদের হার নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু ঢাকা ব্যাংকের এই ইসলামিক ডিপিএস পরিচালিত হয় ইসলামি শরিয়াহর ‘মুদারাবা’ (Mudaraba) নীতিতে। এখানে গ্রাহক হলেন ‘রাব-উল-মাল’ বা বিনিয়োগকারী এবং ব্যাংক হলো ‘মুদারিব’ বা বিনিয়োগ পরিচালক। ব্যাংক গ্রাহকের এই অর্থ বিভিন্ন হালাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত মুনাফার একটি বড় অংশ গ্রাহককে প্রদান করে। ফলে এটি সম্পূর্ণ সুদহীন এবং ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য।

বিকাশ অ্যাপে এই সেবাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে একজন প্রযুক্তি-অনভিজ্ঞ ব্যক্তিও সহজেই এটি পরিচালনা করতে পারেন।

আপনার স্মার্টফোনের বিকাশ অ্যাপটিতে লগ-ইন করার পর হোমস্ক্রিনে অনেকগুলো আইকন দেখতে পাবেন। সেখান থেকে ‘সেভিংস’ (Savings) আইকনটি বেছে নিন। যদি আইকনটি সরাসরি না দেখেন, তবে 'আরও দেখুন' বাটনে ক্লিক করুন। এরপর ‘নতুন সেভিংস খুলুন’ বাটনে ট্যাপ করে প্রক্রিয়ার মূল অংশে প্রবেশ করুন।

এখানে গ্রাহককে দুটি অপশন দেওয়া হয় সাধারণ সেভিংস এবং ‘ইসলামিক সেভিংস’। শরিয়াহ ভিত্তিক মুনাফা পেতে দ্বিতীয় অপশনটি অর্থাৎ 'ইসলামিক সেভিংস' নির্বাচন করতে হবে।

সঞ্চয় মূলত একটি লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়। এখানে আপনাকে বেছে নিতে হবে আপনি কত সময়ের জন্য টাকা জমাতে চান। বিকাশে বর্তমানে ৬ মাস ও ১২ মাস মেয়াদী স্কিম রয়েছে।

এরপর আপনাকে সাপ্তাহিক কিস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। কিস্তির ধাপগুলো হলো ২৫০ টাকা (স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য), ৫০০ টাকা, ১০০০ টাকা, ২০০০ টাকা এবং ৫০০০ টাকা (সর্বোচ্চ কিস্তি)।

পরের ধাপে তালিকা থেকে ‘ঢাকা ব্যাংক’ (Dhaka Bank) সিলেক্ট করুন। এরপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘নমিনি’র তথ্য প্রদান করা। গ্রাহকের অবর্তমানে কে এই সঞ্চয়ের উত্তরাধিকারী হবেন, তার নাম, এনআইডি নম্বর এবং জন্মতারিখ নির্ভুলভাবে ইনপুট দিন।

সবশেষে আপনার সামনে একটি সামারি বা সারসংক্ষেপ আসবে যেখানে আপনার কিস্তি, মেয়াদ এবং সম্ভাব্য মুনাফার তথ্য থাকবে। ব্যাংক এবং বিকাশের নিয়ম ও শর্তাবলি (Terms and Conditions) ভালোভাবে পড়ে নিয়ে সম্মতি বাটনে টিক দিন। সবশেষে আপনার বিকাশের গোপন পিন নম্বর দিয়ে স্ক্রিনের নিচের অংশে ট্যাপ করে ধরে রাখুন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার ডিপিএস খোলার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হবে।

ডিজিটাল ডিপিএসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা। অ্যাকাউন্ট খোলার সাথে সাথেই বিকাশ এবং ঢাকা ব্যাংক থেকে আপনার রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে নিশ্চিতকরণ এসএমএস আসবে।

তাছাড়া, প্রতি সপ্তাহে আপনাকে ব্যাংকে যেতে হবে না বা অ্যাপে ঢুকে টাকা পাঠাতে হবে না। আপনার বিকাশ ওয়ালেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে সিস্টেম থেকে নির্দিষ্ট দিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিস্তির টাকা কেটে নেওয়া হবে।

কিস্তির টাকা কাটার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় ব্যালেন্স রিচার্জ করে রাখুন যাতে কোনো কিস্তি মিস না হয়।

ইসলামিক ডিপিএসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মুনাফাসহ সম্পূর্ণ মূল টাকা সরাসরি গ্রাহকের বিকাশ ব্যালেন্সেই ফেরত চলে আসে। এই টাকা নিয়ে গ্রাহককে আর ব্যাংকে যেতে হয় না।

সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় দিক হলো, এই জমানো টাকা যখন আপনি বিকাশ এজেন্ট থেকে তুলতে বা ক্যাশ আউট করতে যাবেন, তখন আপনাকে কোনো ক্যাশ আউট চার্জ দিতে হবে না। অর্থাৎ, আপনার সঞ্চয় করা প্রতিটি পয়সা আপনি কোনো খরচ ছাড়াই হাতে পাবেন।

মানুষের জীবনে যেকোনো সময় জরুরি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। সেই কথা মাথায় রেখেই বিকাশ এই ডিপিএস সিস্টেমে বিশেষ সুবিধা রেখেছে। যদি মেয়াদ পূর্তির আগেই আপনার টাকার প্রয়োজন হয়, তবে আপনি বিকাশ অ্যাপের সেভিংস সেকশনে গিয়ে সহজেই এটি বন্ধ (Cancel/Withdraw) করতে পারবেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ের আগে বন্ধ করলে মুনাফার হারে তারতম্য হতে পারে, যা গ্রাহক অ্যাপেই দেখতে পাবেন।

যেহেতু এই সঞ্চয় সেবাটি ঢাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং বিকাশ বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই এখানে আপনার অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে। 

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কিছু বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা জরুরি। কখনোই নিজের বিকাশ পিন বা ওটিপি (OTP) কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না, এমনকি পরিচিত কেউ চাইলেও নয়। নমিনি হিসেবে এমন একজনকে নির্ধারণ করুন, যার সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে সহজে পাওয়া যায়। পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট খোলার সময় শর্তাবলি মনোযোগ দিয়ে পড়ে নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তি বা জটিলতা তৈরি না হয়।

এই পদ্ধতিটি অনেকের কাছে সেরা বিবেচিত হয় কয়েকটি কারণে। এটি সম্পূর্ণ কাগজবিহীন—কোনো ফর্ম পূরণ বা সই করার ঝামেলা নেই। মাত্র ২৫০ টাকা দিয়েও সঞ্চয় শুরু করা যায়, যা স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্যও সহজলভ্য। মেয়াদ শেষে টাকা উত্তোলনে কোনো অতিরিক্ত খরচ নেই এবং এটি শরিয়াহসম্মত, অর্থাৎ সুদমুক্ত মুনাফার সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।

বিকাশ এবং ঢাকা ব্যাংকের এই ডিজিটাল ইসলামিক ডিপিএস কেবল একটি সঞ্চয় স্কিম নয়, এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি আধুনিক হাতিয়ার। প্রযুক্তির সাথে ধর্মের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই সেবাটি ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। আপনি যদি আপনার ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে বড় করতে চান এবং সেটি শরিয়াহ ভিত্তিক হতে হয়, তবে আজই বিকাশ অ্যাপ থেকে আপনার ডিপিএস যাত্রা শুরু করতে পারেন।

এএন