কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন অভিভাবক ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন অভিভাবক ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন ও নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এই প্রথমবারের মতো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।

বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনে এই ঐতিহাসিক নিয়োগের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অন্য সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী চার বছরের জন্য তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালন করবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৪ আগস্ট এক সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আইএমএফ-এর সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলেও গত কয়েক দিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেই একদল কর্মকর্তার আন্দোলনের মুখে পড়েন তিনি।

বিদায়ের ঠিক আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. মনসুর বলেছিলেন, "পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।" এর পরেই তাঁর চুক্তি বাতিলের খবর আসে। উল্লেখ্য, ২০২৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। তাঁর বিদায়ের মাধ্যমে সমাপ্ত হলো একটি দেড় বছরের সংস্কারমুখী অধ্যায়, যেখানে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন এবং রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের উপরে উন্নীত করার মতো অর্জন ছিল।

মো. মোস্তাকুর রহমান কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন দক্ষ হিসাববিদ এবং কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ। ১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা এই কৃতি ব্যক্তিত্বের রয়েছে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ (FCMA) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি তৈরি পোশাক খাতের সফল প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত এই কারখানাটি একটি পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া আবাসন খাতেও তাঁর সফল পদচারণা রয়েছে।

তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব এবং ঢাকা চেম্বারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে আমলা বা অর্থনীতিবিদদের বাইরে প্রথমবার একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ায় অর্থনৈতিবিদ মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, একজন ব্যবসায়ী যখন ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক হন, তখন নিজের শ্রেণী বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হবে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় 'অ্যাসিড টেস্ট'। বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, ‘ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেখানে তিনি নির্মোহ থেকে কতটা শক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।

আহসান মনসুরের আমলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসার পর দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ। এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ আদায় করা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নতুন গভর্নরের প্রধান কাজ হবে। মজার বিষয় হলো, নতুন গভর্নরের প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্সেরও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ৮৬ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যা গত বছর পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি অন্যদের প্রতি কতটা কঠোর হতে পারবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকোসহ ১০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর অর্থ পাচার ও লুটপাটের তদন্ত বর্তমানে চলমান। এই তদন্তগুলো যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছানো এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করার গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের নিজস্ব প্রোগ্রাম, চিন্তা এবং প্রেফারেন্স আছে। সেই ভাবনাগুলোর সাথে সংগতি রেখে কাজ করার জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিবর্তন করা হচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেই অব্যাহত থাকবে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে।

নতুন গভর্নরের হাত ধরে তদারকি প্রক্রিয়া আরও আধুনিক ও শক্তিশালী হবে বলে সরকার আশা করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও স্বাধীন করতে মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ বিলুপ্ত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে নতুন গভর্নরের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি সাহসী এবং অপ্রথাগত পদক্ষেপ। তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্পোরেট ফিন্যান্স ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা যদি তিনি নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তবে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসা সম্ভব। তবে ড. আহসান মনসুর যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তা মাঝপথে থমকে যাবে নাকি আরও বেগবান হবে—তা দেখার জন্য আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এএন