ইরান কর্তৃক বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ ঘোষণার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আশঙ্কাজনক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত সোমবার ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড ও নৌবাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, কোনো জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
এই হুমকির পরপরই আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো পারস্য উপসাগরীয় আটটি দেশে পণ্য পরিবহনের বুকিং স্থগিত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অন্তত ৭টি দেশের সঙ্গে বছরে প্রায় ৬৭৫ কোটি ডলারের সরাসরি বাণিজ্য এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আনা-নেওয়া হয়।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার সিংহভাগই ছিল জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং শিল্প কাঁচামাল।
একই সময়ে এই দেশগুলোতে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল অংকের বাণিজ্য এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। আকাশপথ ও সমুদ্রপথ—উভয় দিক থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক উভয় পক্ষই দিশেহারা।
শিপিং কোম্পানিগুলোর ধারণা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১০০০-এর বেশি রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি ডিপো এবং ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত কলম্বো বন্দরে রয়েছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ এই শিল্পগোষ্ঠীর প্রায় ৬০০ কনটেইনার পণ্য বর্তমানে আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে কিছু পণ্য বন্দরে খালাসের অপেক্ষায়, কিছু সাগরে ভাসছে আর কিছু কারখানায় জমা হয়ে আছে। এছাড়া প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল ‘পেট্রোকেমিক্যাল’-এর ১০-১২ হাজার টনের জাহাজীকরণ বাতিল হয়েছে, যা উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
রিভেরাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের শতাধিক কনটেইনার হিমায়িত মাছ বন্দরে ও কারখানায় আটকে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিতে পারে।
জাহাজ কোম্পানিগুলো বুকিং বাতিল করায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কনটেইনার থেকে পণ্য নামিয়ে পুনরায় কারখানায় বা ডিপোতে সরিয়ে নিচ্ছে। টি কে গ্রুপের অন্তত ৪০ কনটেইনার এবং হিফস অ্যাগ্রোর বেশ কিছু চালান এই পরিস্থিতির শিকার। পচনশীল খাদ্যপণ্য ও শাকসবজি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা, কারণ সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে এসব পণ্যের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান উভয়েই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে দেশে কেরোসিন ছাড়া অন্যান্য জ্বালানির মজুত মাত্র দুই থেকে চার সপ্তাহের। নতুন আমদানি সম্ভব না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও এলএনজির দাম দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে দেশে যাতায়াত খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মতো অনেক পোশাক কারখানা তাদের ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ার খবর পাচ্ছে। সামনেই ঈদ, আর এই সময়ে রপ্তানি বন্ধ থাকা মানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে বড় ধরনের সংকটে পড়া।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ না হলে অনেক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকটের সমাধান খুব দ্রুত হবে এমন আশা করা এখন বোকামি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রতি দুটি প্রধান পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প কোন কোন দেশ থেকে দ্রুত জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করা যায়, তার একটি রোডম্যাপ তৈরি করা।
ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানি প্রবাহ সচল রাখার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা।
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা কেবল একটি নৌপথ বন্ধ হওয়া নয়, এটি বাংলাদেশের উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা। একদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বাধা, অন্যদিকে কষ্টার্জিত রপ্তানি বাজার হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকার যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই যুদ্ধের খেসারত দিতে হতে পারে সাধারণ জনগণকে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন