বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার উচ্চমূল্য দিয়ে হলেও জ্বালানির মজুত নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি ইউনিট এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ১০ ডলারের আশেপাশে কেনা হতো, বর্তমানে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন বা পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত সরবরাহকারী দেশ কাতার তাদের সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় সরকার খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে দুটি এলএনজি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া এবং গানভর কোম্পানি থেকে এই বাড়তি দামের গ্যাস কেনা হচ্ছে, যা মার্চের মাঝামাঝি থেকে শেষ নাগাদ দেশে এসে পৌঁছাবে। কর্মকর্তাদের মতে, আকাশচুম্বী দাম দিয়ে এই গ্যাস কেনা হচ্ছে কেবল দেশের শিল্প ও গৃহস্থালির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য।
শুক্রবার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি নিয়েও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা হলেও বর্তমানে তা বাজারে বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। বেসরকারি আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমজিআই এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্চ মাসের জন্য তারা ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করেছে। তবে আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে এপ্রিল থেকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যবসায়ীরা এখন ভিয়েতনাম, তাইওয়ান এবং মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
বাজারে ডিজেল ও অকটেনের সংকট হতে পারে এমন গুজবে গত কয়েক দিনে সারা দেশে তেলের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিপিসি বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এর তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে ডিজেল বিক্রির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। তবে বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৮১ হাজার টনের বেশি ডিজেল মজুত আছে। পেট্রল ও অকটেনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থাকায় এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই এবং আগামী সপ্তাহে বেশ কিছু তেলের জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে যুদ্ধকালীন সতর্কতা হিসেবে সরবরাহ ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যাকে অনেকেই সংকট ভেবে আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর নজরদারি শুরু করেছে।
জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কেবল আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশব্যাপী কৃত্রিমভাবে চাহিদা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার তিন খাতে কঠোর সাশ্রয়ী নির্দেশনা জারি করেছে। ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন খাতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সম্ভব হলে কার পুলিং বা শেয়ারিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সব সরকারি অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি এর তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামানো যাবে না এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও অতিরিক্ত গাড়ির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক খাতে রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং গ্যাস বার্নার ও পাইপলাইন নিয়মিত পরীক্ষা করে অপচয় রোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। চীন, জাপান ও ইউরোপের দেশগুলো এখন জ্বালানি কেনার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্যই বাড়তি দাম দিয়ে আগেভাগে মজুত নিশ্চিত করা হচ্ছে। যদিও এতে সরকারের ব্যয় বহুগুণ বাড়বে, তবুও শিল্প উৎপাদন ও জনজীবন সচল রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি কেবল একটি পণ্য নয়, এটি একটি যুদ্ধাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চড়া দামে জ্বালানি কিনে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার চেষ্টা করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ সামলানো কঠিন হবে যদি না সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী হয়। এপ্রিলের সম্ভাব্য সংকট এড়াতে এখন থেকেই সরকারি সাশ্রয় নীতি মেনে চলা এবং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত মজুত না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন