রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক

১২০ খেলাপির কবজায় লাখ কোটি টাকা, আদায়ে চরম ব্যর্থতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
১২০ খেলাপির কবজায় লাখ কোটি টাকা, আদায়ে চরম ব্যর্থতা

দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক এবং বিডিবিএল এই ছয়টি ব্যাংকের শীর্ষ ১২০ জন ঋণখেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। 

অথচ গত এক বছরে এই বিশাল পাহাড়সম ঋণের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র আধা শতাংশ বা ৪৬৯ কোটি টাকা। এই চিত্র কেবল ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নয়, বরং দেশের আর্থিক কাঠামোর এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই ছয় ব্যাংকের প্রতিটির শীর্ষ ২০ জন করে মোট ১২০ জন খেলাপির কাছে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ২০২৫ সালে এই বিশাল অংকের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় মাত্র ৫০ পয়সা আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকগুলো।

তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই পাওনা ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক ৬ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করেছে মাত্র ৯ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে রূপালী ব্যাংক কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের আদায়ে গতি নেই বললেই চলে।

বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং আদায়ের ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামোর ওপর। পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, ছয় ব্যাংকের মধ্যে চারটিই বর্তমানে তীব্র মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক এবং বেসিক ব্যাংকের অবস্থা ঐতিহাসিকভাবেই নাজুক। রূপালী ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতিও দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

সোনালী ও বিডিবিএল ছাড়া বাকি ব্যাংকগুলো মূলত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে এই ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হলেও তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা একে "লাইফ সাপোর্ট"-এ থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পর্যালোচনায় একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। সাধারণ মানুষ এখনো সরকারি ব্যাংককে নিরাপদ মনে করে টাকা রাখছেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিচ্ছে ঋণের বিতরণে। ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করলেও তা সঠিক খাতে বিনিয়োগ করতে পারছে না। বিশেষ করে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) এবং কৃষি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মানছে না কয়েকটি ব্যাংক।

সোনালী ব্যাংকের মতো বড় ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন তারা মুষ্টিমেয় কিছু বড় কোম্পানিকে ঋণ না দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বড় ঋণের ক্ষেত্রেই ডিফল্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকছে এবং সেই ঋণগুলোই পরে খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) মতে, শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী মামলা। ঋণখেলাপিরা ঋণের কিস্তি না দিয়ে আদালতের আশ্রয় নিয়ে স্থগিতাদেশ (Stay Order) নিয়ে আসছেন। ফলে ব্যাংকগুলো আইনগতভাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান যেমনটি জানিয়েছেন, মামলার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে বড় অংকের আদায় সম্ভব হচ্ছে না।

২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ছয় ব্যাংকের মধ্যে কেবল সোনালী ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা (২,৩৭৯ কোটি টাকা) করতে পেরেছে। অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক সামান্য মুনাফার মুখ দেখলেও জনতা, বেসিক এবং বিডিবিএল কোনো মুনাফাই করতে পারেনি। উল্টো জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে ৭০ শতাংশে, যা যেকোনো আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য একটি অস্বাভাবিক এবং ভীতিকর পরিসংখ্যান।

প্রকাশ্য খেলাপি ঋণের বাইরেও ২১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকার ঋণ 'অবলোপন' (Write-off) করা হয়েছে। এর মানে হলো, এই টাকাগুলো ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে সরিয়ে আলাদা খাতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংকেরই রয়েছে ৯ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। গত বছর এই বিশাল অংকের অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ২৪৫ কোটি টাকা। এটি প্রমাণ করে যে, একবার ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে তা আদায়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কেবল নীতিমালার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। তার মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী এবং এর জন্য প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে সাধারণ মানুষের আমানত ঝুঁকির মুখে পড়বে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। ১২০ জন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ১ লাখ কোটি টাকা জিম্মি হয়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি এই বিশাল অংকের অর্থ আদায় করা সম্ভব না হয় এবং ঋণের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে ব্যাংকগুলো অদূর ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটে পড়বে। এখন সময় এসেছে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই খেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করার।

এএন