অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে নতুন মেয়াদের এই প্রথম বাজেট পেশ করেছেন। এবারের বাজেটে শুল্ক ও কর কাঠামোর ব্যাপক রদবদল ঘটানো হয়েছে। সাধারণত বাজেটে দাম বাড়ার তালিকা দীর্ঘ হলেও, এবার জনস্বস্তি ও দেশীয় শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে শুল্ক ছাড়ের পরিধি বেশ বড় রাখা হয়েছে।
সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই পরিবর্তন বাজারে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক কোন কোন পণ্য ও সেবার পেছনে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে, আর কোন কোন খাতে মিলবে স্বস্তি।
বাজেটে বেশ কিছু আমদানিকৃত বিলাসবহুল পণ্য, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদান এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে কিছু পণ্যের দাম বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে রয়েছে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য, যেখানে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সিগারেটের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নস্তরে প্রতি ১০ শলাকার সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা এবং উচ্চ ও অতি উচ্চ স্তরে যথাক্রমে ১৬০ টাকা ও ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও করভার বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসির ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনযুক্ত আমদানিকৃত গাড়ির মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এতে মধ্যবিত্তের পছন্দের এই রেঞ্জের গাড়িগুলোর দাম বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদেশি ফল ও খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রেও শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। দেশীয় চাষিদের সুরক্ষায় প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত বিদেশি কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক ১% ও ৫% থেকে বাড়িয়ে ২৫% করা হয়েছে। মধু ও সুপারি আমদানির শুল্কায়ন মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। তৈরি খাবার, কফি, সুগার কনফেকশনারি ও প্যাকেটজাত খাবারের ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়েছে।
বিদেশি মাছ ও এলপিজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। বিদেশ থেকে আনা পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হয়েছে। আমদানিকৃত কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্মাণ সামগ্রী ও প্রসাধনী পণ্যের মধ্যেও রড, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, ফোম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সাইকেল ও খেলনার ওপর শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধির কারণে দাম বাড়বে।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটে বড় স্বস্তির খবরও রয়েছে। ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমার আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর সব ধরনের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশুখাদ্য, মসলা ও খেজুরের ওপর থেকেও শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
চিকিৎসা খাতে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর তুলে নেওয়া হয়েছে, ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে। ক্যানসারের ওষুধসহ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামালেও রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির করভার ৯৩% থেকে কমিয়ে ৬৪% করা হয়েছে এবং চার্জিং সরঞ্জামেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সোনার গয়নার ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% করা হয়েছে, ফলে অলঙ্কার কেনা কিছুটা সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি গিটার, পিয়ানো ও ভায়োলিনের মতো বাদ্যযন্ত্র এবং সিনেমাটোগ্রাফিক সরঞ্জামের ওপরও শুল্ক কমানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাজেটে একদিকে বিলাসপণ্য ও কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত থাকলেও, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের স্বস্তি এসেছে। তবে বাজারে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে কার্যকর মনিটরিং ও ব্যবসায়ীদের আচরণের ওপর।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন