‘জাতীয় শিক্ষাক্রম-২১’ বাতিলের দাবিতে ছাত্র ফ্রন্টের বিক্ষোভ সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৪, ০৬:২৮ পিএম
‘জাতীয় শিক্ষাক্রম-২১’ বাতিলের দাবিতে ছাত্র ফ্রন্টের বিক্ষোভ সমাবেশ

জাতীয় শিক্ষাক্রম বাতিলের দাবিতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।  বুধবার (৬ মার্চ, ২০২৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।  সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, ব্যানার ফেস্টুনে জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনুষ্যত্ব ধ্বংসের শিক্ষাক্রম বাতিল কর, নতুন শিক্ষাক্রম বেসরকারিকরণ বানিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি করবে, সাধারণ ধারাকে কারিগরিকরণ করা চলবে না ইত্যাদি লেখা ছিল। উক্ত সমাবেশে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক নওশিন মুসতারি সাথী এবং প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম সাদিক।

সমাবেশে সাদেকুল ইসলাম সাদিক বলেন, “এই শিক্ষাক্রম জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনুষ্যত্বের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। এটা বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীরা রুচি, সংস্কৃতি, চিন্তায়, মননে সার্বিকভাবে বিকশিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে না। তাদের চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা কমবে। তৈরি হবে খণ্ডিত জ্ঞানের মানুষ। কেননা, এই শিক্ষাক্রমের নীতি ও উদ্দেশ্য শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা নয়, দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা। ব্যবসায়ীদের জন্যে মুনাফা তৈরির উপযোগী দক্ষ ও অনুগত আমলা ও কর্মী বাহিনী তৈরি করা।”

নওশিন মুসতারি সাথী বলেন, “এই শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিখনকালীন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আসা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এরকম পদ্ধতি উন্নত দেশগুলোতেও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র হচ্ছে, পৃথিবীর যে দেশগুলোতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রচলিত সেখানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত প্রায় ১:১৫। কিন্তু আমাদের দেশে?

সরকারি প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশে সে অনুপাত ১:৫৪। বাস্তবে একজন শিক্ষককে প্রায় ৬০-৭০ জনের ক্লাস পরিচালনা করতে হয়। শুধু তাই নয় ঘঞজঈঅ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে এক লক্ষ শিক্ষক পদ শূন্য। প্রাথমিক শিক্ষা পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এক লক্ষ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের দেশে অবকাঠামোগত এই ঘাটতিগুলো পূরণের কোনো পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছরই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমছে, যা বরাদ্দ হচ্ছে তাও দুর্নীতি লুটপাটের কারণে যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।”

সমাবেশের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‍‍`জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ হলো সুন্দর সুন্দর কথার মোড়কে শিক্ষা ধ্বংসের একটি নীলনকশা। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণ আরো তীব্র হবে। যা সাধারণ গরিব মানুষের শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করবে। শিক্ষকদের হাতে যে মার্কস রাখা হয়েছে তাতে স্বজন পোষণ ও দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নেবে। নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব কমানো হয়েছে। মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘শিল্প-সংস্কৃতি’, ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা’, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ ইত্যাদি সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোর উপর। এই শিক্ষাক্রম সৃজনশীল, চিন্তাশীল ও মানবিক মানুষ তৈরির পরিবর্তে হাতের কাজ জানা সস্তা শ্রমিক তৈরি করবে। এই শিক্ষাক্রম রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করবে। এর জায়গায় গড়ে উঠবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল। এভাবেই গরীব-প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে শিক্ষাকে কেড়ে নিয়ে শিক্ষা ব্যবসার পথ প্রশস্ত হবে।"

তিনি আরও বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হলে নাকি গাইড বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হবে। ২০১০ সালে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালুর সময়ও একই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি এই শিক্ষাক্রম গাইড বাণিজ্য ও কোচিং বাণিজ্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সরকার ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করছে, এই শিক্ষাক্রম চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী দক্ষ মানুষ তৈরি করবে। এতে নাকি বেকারত্ব কমবে। কিন্তু আমরা বলছি, বেকারত্বের জন্যে দায়ী বিদ্যমান পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক কাঠামো। শুধু দক্ষ মানুষ তৈরি হলেই বেকারত্ব কমবে না, যদি শিল্পায়ন না হয়, কর্মসংস্থান তৈরি না হয়। এই ব্যবস্থা আজকে আর শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারছে না। এই অপারগতা ঢাকার জন্যে বেকারত্বের দায় শিক্ষার উপর চাপানো হচ্ছে। এসব রংচঙে কথা বলে শিক্ষার বেসরকারীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং কারিগরীকরণ হচ্ছে।”

তিনি সারাদেশে শিক্ষার্থী-অভিভাবক এবং শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “জ্ঞান-বিজ্ঞান-মনুষ্যত্ব ধ্বংসকারী এই শিক্ষাক্রম বাতিল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক, একই ধারার শিক্ষার পরিপূরক শিক্ষাক্রম চালুর দাবিতে ছাত্র ফ্রন্টের উদ্যোগে চলমান স্বাক্ষর সংগ্রহের অভিযানে আপনারা অংশগ্রহণ করুন, সহযোগিতা করুন এবং সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকাগুলোতে আপনারা ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাকরা মিলে শিক্ষা রক্ষার লক্ষ্যে ‘শিক্ষা রক্ষা কমিটি’ গড়ে তুলুন।”

বিআরইউ