যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান জিমনেশিয়ামে পুনরায় বড় পর্দায় ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শনের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে সেখানেই খেলা প্রদর্শন করেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ সড়কে নিজস্ব উদ্যোগে খেলা প্রদর্শন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, প্রশাসনিক ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মঘণ্টা নষ্ট করার অভিযোগে ১০ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এটি একটি ন্যায্য দাবি উপস্থাপন, যা কোনো অপরাধ নয়। এছাড়া ঘটনাস্থলে স্বশরীরে উপস্থিত না থেকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
জানা যায়, গত ৭ জুলাই জিমনেশিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে জিমনেশিয়ামের পরিবর্তে বিভিন্ন আবাসিক হলে খেলা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। তবে এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল, আগের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে বড় পর্দায় একসঙ্গে বিশ্বকাপ খেলা দেখার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা। ফলে গত রোববার সকালে একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সড়কে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের খেলা দেখানোর উদ্যোগ নেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে কোনো বাস বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারেনি এবং আসতেও পারেনি।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে পৃথকভাবে ১০ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রধান ফটক বন্ধ করে খেলা প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বের হতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব কার্যক্রম, প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের Rules of Discipline for Students অনুযায়ী কেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয় বিধি অনুযায়ী একতরফাভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখ আবু সুফিয়ান বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন করা কোনো অপরাধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্থান। আমি বিশ্বাস করি, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে দমন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা কখনোই কোনো প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। আর এটাই যদি প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হয়, তাহলে তারা স্বৈরাচারী প্রশাসন। আর স্বৈরাচারের পতন অবধারিত। আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আরেক শিক্ষার্থী রাকিব হাসান সিহাব বলেন, আমাদের একটাই দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য বড় পর্দায় জিমনেশিয়ামে খেলা দেখার ব্যবস্থা করা। গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর কারণে পুরো শিক্ষার্থী সমাজকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছি এবং স্মারকলিপিও দিয়েছি। কিন্তু আমাদের যৌক্তিক দাবির কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন করা কোনো অপরাধ নয়।
তিনি আরও বলেন, দুঃখজনকভাবে অধিকার চেয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের অপরাধীর মতো বিবেচনা করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতে, সংলাপের পরিবর্তে এ ধরনের পদক্ষেপ কোনো শক্তির পরিচয় নয়, বরং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্বলতা, অদূরদর্শিতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
অন্য এক শিক্ষার্থী সামিউল বলেন, আমি ওই দিন সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। আর আমি আমার সব বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, খেলা প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জিমনেশিয়ামে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলের অভ্যন্তরে খেলা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে মূল ফটক বন্ধ করে স্বউদ্যোগে সেখানে খেলা প্রদর্শন করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো বাস বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারেনি, আবার আসতেও পারেনি। যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যেকোনো যৌক্তিক দাবির পক্ষে আমরা। তারা যদি যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা পুনর্বিবেচনা করবে।
এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি করেছিল। যারা স্বশরীরে সেখানে ছিলেন না, তারা অন্য কোনোভাবে এই ঘটনায় পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এজন্য তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তারাও যদি যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেন, তাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনর্বিবেচনা করবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন