রাজশাহী নগরীর পদ্মাপাড়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘বড়কুঠি’ একসময় ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) জন্ম ও প্রাথমিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র। তবে সময়ের পরিক্রমায় প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেই। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও স্থাপনাটি ফেরত পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে সাহেববাজার ও রাজশাহী কলেজের দক্ষিণে অবস্থিত বড়কুঠি আঠারো শতকের ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন। ইট নির্মিত, সমতল ছাদবিশিষ্ট দ্বিতল ভবনটির দৈর্ঘ্য ২৪ মিটার, প্রস্থ ১৭ দশমিক ৩৭ মিটার এবং এতে মোট ১২টি কক্ষ রয়েছে। ভবনের কেন্দ্রে একটি বড় সভাকক্ষ, যার উত্তর ও দক্ষিণে বারান্দা এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাশে কয়েকটি কক্ষ রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়কুঠির চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীরা বাগানে পরিচর্যার কাজ করছেন। পদ্মার শান্ত পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটির নান্দনিকতা দর্শনার্থীদের কাছে অতীতের স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৮১৪ সালে ডাচরা ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বড়কুঠিসহ ভারতের সব বাণিজ্যকেন্দ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে। কোম্পানি ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত ভবনটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। পরে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পাকিস্তান সরকার বড়কুঠি ও এর সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আগে বড়কুঠি ছিল উপাচার্যের কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন। নিচতলায় ছিল প্রশাসনিক দপ্তর এবং ওপরতলায় উপাচার্যের বাসভবন। পরবর্তীতে প্রশাসনিক কার্যক্রম মতিহারে স্থানান্তরিত হলে ভবনটির নিচতলা সহকারী কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয় এবং ওপরতলা টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে বড়কুঠি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এটিকে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাইমিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর পড়াশোনা করেও বড়কুঠি সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। যেহেতু এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশ, তাই বিশ্ববিদ্যালয়েরই উচিত ছিল বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা এবং স্থাপনাটি নিজেদের অধীনে রাখার উদ্যোগ নেওয়া।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে বড়কুঠি নিয়ে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক দলিল না থাকলেও নেদারল্যান্ডসের আর্কাইভে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ১৭ থেকে ১৮ শতকে ওলন্দাজ বণিকরা পদ্মা নদীর তীরে বড়কুঠি নির্মাণ করেন, যা মূলত একটি বাণিজ্যিক গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী বড়কুঠি থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম মতিহার ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ২০২০ সালের দিকে এর নিয়ন্ত্রণ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে চলে যায়।
পুঠিয়া রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান বলেন, বড়কুঠি ২০১৮ সালে সরকারিভাবে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। বর্তমানে ভবনটির আংশিক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে এটি বরেন্দ্র জাদুঘরের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়।
তিনি জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ-সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী বড়কুঠিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে এবং বর্তমানে এটি সরকারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বড়কুঠি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এর বিরোধিতা করছে। এটি ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছি। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।”
ভূমিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু বলেন, “উপাচার্য বড়কুঠি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করছি, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে খুব শিগগিরই এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।”
এম জি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন