বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত রোববার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ও পরে মোট সাত দিন দেশজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় থাকবে। বিশেষ করে ভোটের আগের চার দিন সারা দেশে ‘নিবিড় টহল’ দেবে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী।
নির্বাচনী মাঠের আইনশৃঙ্খলার সুরক্ষায় এবার প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে ১ লাখ সেনাসদস্যের উপস্থিতি। নির্বাচনে সারা দেশে নিবিড় টহলের জন্য সেনাবাহিনী সদস্য থাকবেন এক লাখের মতো। সবচেয়ে বড় জনবল হিসেবে থাকবে আনসার ও ভিডিপি। নির্বাচনে প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার আনসার ও ভিডিপির সদস্য নির্বাচনি টহলে থাকবে। এছাড়াও দেড় লাখ পুলিশ তদন্ত ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রায় ৩৭ হাজার বিজিবি সদস্য নির্বাচনে উপস্থিত থাকবেন। র্যাব সদস্য ৭ হাজার ৭০০ এর মতো নির্বাচনে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়াও নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোষ্টগার্ডের ৩ হাজার ৫০০ ও ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে কাজ করবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৮,৭৮০টি কেন্দ্র। ঝুঁকিপূর্ণ ১৬,৫৪৮টি কেন্দ্র। সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৭,৪৩৩টি কেন্দ্র।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে মোতায়েন করা হবে বিশেষ কমান্ডো টিম এবং সার্বক্ষণিক ড্রোন নজরদারি।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। ভোট জালিয়াতি এবং বুথ দখল রোধে ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
বডি ওর্ন ক্যামেরা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পোশাকের সাথে ঝুলানো থাকবে ২৫ হাজার বডি ক্যামেরা। এতে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি মুহূর্ত রেকর্ড করা হবে। ইতিমধ্যে ১৯ হাজার ক্যামেরা সরবরাহ করা হয়েছে।
ড্রোন নজরদারি: আকাশপথে ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করবে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং বড় শহরগুলোর ওপর দিয়ে এই ড্রোনগুলো চব্বিশ ঘণ্টা টহল দেবে।
সিসিটিভি ক্যামেরা: প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা স্থানীয় বাজেটে এই ক্যামেরাগুলো স্থাপন করবেন।
বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য শনাক্তে এবার বড় পরিসরে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে। বিজিবি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৫০টি ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করবে। এছাড়া র্যাব ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এবং ডিএমপি ও সিএমপি পৃথকভাবে ডগ স্কোয়াড নিয়োজিত রাখবে। দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পৌঁছাতে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় অপপ্রচার রোধে বিটিআরসি (BTRC) এবং এনটিএমসি (NTMC)-কে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইসিটি বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং করবে। কোনো ধরনের গুজব ছড়ালে বা তথ্য বিকৃতি করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আবদুল আলীম মনে করেন, প্রযুক্তি ও বিশাল বাহিনীর উপস্থিতি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মাঠে শুধু বাহিনী থাকলেই হবে না, তাঁদের ভূমিকা হতে হবে নিরপেক্ষ ও কার্যকর। বডি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহারের ফলে অনিয়মকারীরা ভয় পাবে, যা একটি অবাধ নির্বাচনের জন্য জরুরি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর নিরাপত্তা নকশা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। প্রযুক্তির সাথে বাহিনীর পেশাদারিত্বের সমন্বয় যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার অপেক্ষায়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন