আজকের বাংলাদেশে এমন পরিবার খুব কমই আছে, যেখানে অন্তত একজন ডায়াবেটিস রোগী নেই। একসময় এই রোগকে বলা হতো 'ধনীদের রোগ', কিন্তু এখন গ্রামের দিনমজুর থেকে শুরু করে শহরের অফিসকর্মী-সবার শরীরেই ডায়াবেটিস এক ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই রোগের মূল ভয় শুধু এর উপস্থিতি নয়, বরং এর অবহেলা, অনিয়ম ও অজ্ঞতা। অনেকেই জানেন না কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কীভাবে জীবনযাপন করলে এ রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব। ফলত, ডায়াবেটিস হয়ে উঠছে অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
ডায়াবেটিস আসলে কী?
ডায়াবেটিস হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীরে ইনসুলিন নামের হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে কাজ করে না বা শরীর ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়, আর দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-চোখ, কিডনি, হৃদযন্ত্র, স্নায়ু ও রক্তনালীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (BADAS) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো: এই সংখ্যার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জানেনই না যে তারা এই রোগে ভুগছেন।
কেন এত দ্রুত বাড়ছে ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস কেবল জেনেটিক বা বংশগত নয়, এটি এখন মূলত জীবনযাপনের রোগ (lifestyle disease)। আমাদের দৈনন্দিন অনিয়মই এই রোগের সবচেয়ে বড় কারণ।
- অতিরিক্ত ভোজন ও ফাস্টফুডে অভ্যস্ততা: আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে চিনি, ময়দা ও তেলজাত খাবারের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: শহরের মানুষ দিনে ৮-১০ ঘণ্টা বসে কাজ করে, হাঁটে না, শরীরচর্চা করে না।
- মানসিক চাপ ও অনিদ্রা: মানসিক চাপ ইনসুলিনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়।
- অভ্যাসগত অবহেলা: অনেকেই ভাবেন 'ডায়াবেটিস মানে শুধু একটু চিনি বেশি'-এই ভুল ধারণাই মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করে।
ডায়াবেটিসের ভয়াবহ প্রভাব
ডায়াবেটিসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’, কারণ এটি ধীরে ধীরে শরীরের ভেতর থেকে ক্ষতি করে, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে বুঝা যায় না।
- চোখের রেটিনা নষ্ট হয়ে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস বা অন্ধত্ব সৃষ্টি করে।
- রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
- কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়।
- ক্ষত শুকায় না, ফলে পা কেটে ফেলতে হয়-যা বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
- প্রতিটি ক্ষেত্রেই কারণ একটাই-অবহেলা ও নিয়ম না মানা।
বাঁচার পথ: নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা
ডায়াবেটিস থেকে বাঁচা বা এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন নয়, যদি আমরা নিজের অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারি।
এখানে রয়েছে কিছু বাস্তবধর্মী করণীয়-
সঠিক খাদ্যাভ্যাস: খাদ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি। প্রতিদিনের খাবারে চাল, আলু, চিনি ও তেলজাত খাবার কমাতে হবে। ভাতের বদলে মোটা চাল, গম বা ওটস খাওয়া ভালো। শাকসবজি, ডাল, টকদই, মাছ ও ফলমূল (বিশেষ করে কম মিষ্টি ফল যেমন পেয়ারা, আপেল) রাখতে হবে। দিনে তিনবারের বেশি খাবার ভাগ করে নিতে হবে, একবারে বেশি খাওয়া যাবে না।
নিয়মিত ব্যায়াম: ব্যায়াম হলো ইনসুলিনের প্রাকৃতিক সহায়ক। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার, গাড়ির বদলে হাঁটা-এগুলো ছোট অভ্যাস হলেও ফল দেয় বড়।
মানসিক চাপ কমানো: চাপ বা দুশ্চিন্তা শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। নামাজ, ধ্যান, কুরআন তেলাওয়াত, প্রার্থনা বা নিয়মিত বিশ্রাম মানসিক প্রশান্তি আনে।
ওষুধ ও ইনসুলিন নিয়ম মেনে: অনেকে ওষুধ খাওয়া ভুলে যান বা বন্ধ করে দেন-এটি ভয়ংকর ভুল। ডায়াবেটিস কখনো পুরোপুরি সারে না, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই ডাক্তার যে পরামর্শ দেন, সেটি নিয়মিত মেনে চলা অপরিহার্য।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রতি তিন মাসে একবার রক্তে শর্করার মাত্রা, কিডনি ও চোখ পরীক্ষা করা উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় রোগের জটিলতা ধরা পড়লে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের দেহ আল্লাহর আমানত। এই দেহকে যত্নে না রাখা, নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন থাকা মানে সেই আমানতের অবমূল্যায়ন করা। ইসলাম বা যেকোনো ধর্মেই বলা হয়েছে-সংযম, পরিচ্ছন্নতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণই স্বাস্থ্যরক্ষার মূল ভিত্তি। যে ব্যক্তি খাবারে, ঘুমে, কাজে ও বিশ্রামে নিয়ম মেনে চলে-সে নিজের শরীরকে যেমন বাঁচায়, তেমনি সমাজকেও এক দৃষ্টান্ত উপহার দেয়।
গ্রাম ও শহরে সচেতনতার বৈষম্য
শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ এখনো অনেক বেশি অজ্ঞ এই রোগ নিয়ে। অনেকে ওষুধ না খেয়ে ভেষজ বা তাবিজ-কবজে ভরসা রাখেন, যা বিপর্যয় ডেকে আনে। অন্যদিকে শহরের মানুষ জানলেও মানেন না। ফলে দু’দিকেই সমস্যা-একদিকে অজ্ঞানতা, অন্যদিকে অনিয়ম। এই দুই দিকই ডায়াবেটিসকে 'অপরাজেয় শত্রু,'তে পরিণত করেছে।
সরকার ও সমাজের ভূমিকা
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইস্যু।
- প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং ও পরামর্শ কেন্দ্র চালু করা উচিত।
- গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে-বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে।
- স্কুল-কলেজ পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষার পাঠে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
- যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেবে।
- ডায়াবেটিস কোনো তাৎক্ষণিক বিপদ নয়, কিন্তু এটি নীরবে শরীরকে দুর্বল করে দেয়, জীবনকে ছোট করে দেয়।
- একটু নিয়ম, একটু সচেতনতা, আর নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা-এই তিনেই আছে বাঁচার উপায়।
আজ থেকেই আমরা যদি নিয়মিত হাঁটা শুরু করি, খাবারে সংযম রাখি, চিনির প্রতি আসক্তি কমাই এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জনের চেষ্টা করি-তাহলে ডায়াবেটিসের মতো রোগও আমাদের জয় করা সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যই জীবন, আর সংযমই সেই জীবনের সুরক্ষা।
নিজেকে ভালো রাখলে পরিবার ভালো থাকবে, পরিবার ভালো থাকলে সমাজও সুস্থ হবে।
ডায়াবেটিসকে ভয় নয়-নিয়ন্ত্রণই হোক আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন