বর্তমান সময়ে ব্রেন স্ট্রোক একটি ভয়াবহ ও জীবনসংকটপূর্ণ রোগে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ করেই মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা বা রক্তক্ষরণের ফলে মস্তিষ্কের একটি অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয় একেই বলা হয় 'স্ট্রোক' বা 'ব্রেন অ্যাটাক'।
অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের মতো দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে রোগীর মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে, এমনকি মৃত্যু ঘটতেও পারে। তাই ব্রেন স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক করণীয় জানা অত্যন্ত জরুরি।
ব্রেন স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটার ফলে মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যাওয়া। এটি সাধারণত দুই প্রকার ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke), যেখানে মস্তিষ্কের রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, এবং হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke), যেখানে রক্তনালী ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। এই দুই ধরণের স্ট্রোকই অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দ্রুত চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে।
স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো হঠাৎ করে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে না পারা, চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো, তীব্র মাথাব্যথা বা বমি বমি ভাব, এবং মুখের এক পাশ হেলে পড়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
স্ট্রোক শনাক্তে F.A.S.T. নিয়মটি মনে রাখুন: F – Face: মুখ হেলে পড়েছে কি না দেখুন, A – Arm: এক হাত তুলতে পারছে কি না দেখুন, S – Speech: কথা জড়াচ্ছে কি না লক্ষ্য করুন, T – Time: সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ‘প্রথম ঘন্টা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে রোগীকে বাঁচানো এবং স্থায়ী প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তাৎক্ষণিক করণীয় ধাপগুলো হলো অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন (৯৯৯ বা নিকটস্থ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন), রোগীকে সমতল জায়গায় শুইয়ে মাথা সামান্য উঁচু করে দিন, কোনো খাবার বা পানি দেবেন না কারণ এতে শ্বাসরোধ হতে পারে, রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও নাড়ি পরীক্ষা করুন এবং প্রয়োজনে কৃত্রিম শ্বাস (CPR) দিন, হাসপাতালে যাওয়ার পথে সুযোগ থাকলে অক্সিজেন দিন, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেবেন না।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক সাধারণত প্রথমেই CT Scan বা MRI করে স্ট্রোকের ধরন নির্ণয় করেন— রক্তক্ষরণ নাকি রক্তনালী ব্লক। ইস্কেমিক স্ট্রোকে রক্ত জমাট ভাঙার ইনজেকশন (tPA – Tissue Plasminogen Activator) ৪.৫ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োগ করা হয়, প্রয়োজনে ব্লক খুলতে Mechanical Thrombectomy করা হয়। হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তপাত বন্ধ করতে ওষুধ বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
স্ট্রোক থেকে বেঁচে যাওয়ার পর রোগীর শরীরের কিছু অংশ অবশ হতে পারে বা কথাবলার সমস্যা দেখা দিতে পারে, তাই পুনর্বাসন থেরাপি অপরিহার্য। এ সময় ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে অবশ অঙ্গ সচল রাখতে হবে, স্পিচ থেরাপি নিতে হবে, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং রোগীকে মানসিকভাবে শক্ত রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কারণগুলো হলো উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত স্থূলতা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং বয়স ৪০-এর বেশি বা পারিবারিক ইতিহাসে স্ট্রোক থাকা।
প্রতিরোধের উপায় হলো, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, সুষম খাদ্যগ্রহণ করা (কম লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া), এবং চাপমুক্ত জীবনযাপন ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
ব্রেন স্ট্রোক এমন একটি জরুরি অবস্থা যা মুহূর্তের ভুলে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা মাত্র দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াই একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত। মনে রাখবেন স্ট্রোকে সময় মানেই জীবন। সময় হারালে জীবন হারাবেন।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন