আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি আমাদের প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে। কর্মব্যস্ততা, যাতায়াতের ঝামেলা, পরিবার সামলানোর চাপ সব মিলে নিজের যত্ন নেওয়ার সময় যেন ক্রমেই কমে আসছে। ফলে ক্লান্তি, অবসাদ, মানসিক চাপ এমনকি বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
কিন্তু সুখবর হলো, স্বাস্থ্য রক্ষায় সবসময় বড় কিছু করতে হয় না। বরং দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তুললেই তা শরীর ও মনে বিশাল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। ব্যস্ত মানুষও সহজেই পালন করতে পারে এমন কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই আজকের এই আলোচনায় তুলে ধরা হলো।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি খাওয়া শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় করে, মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময়ের উপবাস শেষে শরীরকে নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত করে। অনেকেই ভাবেন সকালে পানির বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়; বাস্তবে এটি দিনের বাকি সময়টুকু কীভাবে কাটবে তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জিমে যাওয়া বা নিয়মিত ব্যায়াম করার সময় সবার থাকে না। কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিটের কিছু স্ট্রেচিংও শরীরের জয়েন্ট সচল রাখে, সারা দিনের ক্লান্তি কমায় এবং ঘাড়-ব্যথা, কোমর-ব্যথা প্রতিরোধে সাহায্য করে। সকালে ঘরেই হাত-পা মেলানো, ঘাড় ঘোরানো, পিঠে হালকা টান দেওয়া এই সামান্য ব্যায়ামই ব্যস্ত মানুষের বড় সঙ্গী হতে পারে।
নাস্তা বাদ দেওয়া আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত একটি ভুল অভ্যাস। ব্যস্ততার কারণে অনেকেই খালি পেটে বাসা থেকে বের হন, যা শরীরের শক্তি কমিয়ে দেয় এবং মনোযোগ নষ্ট করে। বরং ডিম, ওটস, কলা বা দই যেকোনো সহজ কিন্তু পুষ্টিকর নাস্তা দিনের কর্মশক্তি বাড়ায়। নাস্তা শরীরের বিপাকগত কার্যক্রমও সঠিক রাখে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
ব্যায়াম করার সময় না পেলেও প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা খুব সহজ। অফিসে যেতে সিঁড়ি ব্যবহার করা, গাড়ি থেকে একটু দূরে নেমে কিছুটা পথ হাঁটা, ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটাহাঁটি করা এসবই হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, হাঁটা মানসিক চাপ কমায় এবং কাজের দক্ষতা বাড়ায়।
ব্যস্ততার কারণে অনেকেই পানি পান করতে ভুলে যান। অথচ শরীরের সঠিক কার্যক্রমের জন্য নিয়মিত পানি প্রয়োজন। প্রতি ঘণ্টায় ১ গ্লাস পানি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, ত্বকের শুষ্কতা এবং অন্যমনস্কতার মতো সমস্যা কমে। চাইলে মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করা যেতে পারে।
দ্রুত কাজ সারতে গিয়ে অনেকেই ফাস্টফুড, চিপস, কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এগুলো অল্প সময় তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ক্ষতি করে। তার বদলে সহজে পাওয়া যায় এমন স্বাস্থ্যকর বিকল্প ফল, বাদাম, দই, সেদ্ধ ডিম, সালাদ এসবকে খাবারের তালিকায় রাখলে শরীর পুষ্টি পায়, শক্তিও ধরে রাখে।
ডিজিটাল যুগে দিনে কয়েক ঘণ্টা মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাব ছাড়া চলাই যায় না। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকালে চোখ শুকিয়ে যায়, মাথাব্যথা ও মনোযোগ কমে। এজন্য '২০-২০-২০' নিয়মটি খুব কার্যকর প্রতি ২০ মিনিটে ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে তাকানো। এতেই চোখের চাপ অনেকটা কমে।
সারাদিনের চাপের মাঝে অনেকেই মানসিক বিশ্রাম নেন না। অথচ মাত্র পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিলে মন সতেজ হয়, কাজের গতি বাড়ে। এই ছোট অভ্যাসটি কাজের স্থানে বসেই করা যায়, কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে চাপযুক্ত পেশাজীবীদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার ঘুমের মান কমিয়ে দেয়। মোবাইলের নীল আলো মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, ফলে ঘুম দেরিতে আসে। শোবার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্ক্রিন বন্ধ রেখে বই পড়া, হালকা সঙ্গীত শোনা বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বেশ ভালো বিকল্প হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি ধরে রাখে এবং পরের দিনকে কাজের উপযোগী করে। ব্যস্ত মানুষদের জন্য ঘুমের সময় নির্দিষ্ট রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং একই সময়ে জাগা এই দুটি অভ্যাসই শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে সঠিক রাখে।
অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে কেউ কেউ খুব দেরিতে বা একসঙ্গে অনেক খাবার খেয়ে ফেলেন। এটি শরীরের হজমক্ষমতা নষ্ট করে। অল্প করে, বারবার, স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে শরীর বেশি শক্তি পায় এবং পেটের সমস্যা কমে।
টানা কাজ শরীর ও মন দুটোকেই ক্লান্ত করে। প্রতি ১-২ ঘণ্টায় ২ মিনিট দাঁড়িয়ে হাঁটা বা শরীর নড়াচড়া করলে রক্তসঞ্চালন ঠিক থাকে। এতে কর্মদক্ষতা বাড়ে, মানসিক ক্লান্তিও কমে।
ব্যস্ততার মাঝেও নিজের জন্য প্রতিদিন সামান্য কিছু সময় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেটা বই পড়া, প্রিয় গান শোনা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বা নিজের শখের কাজ করা যাই হোক না কেন, মন ভালো রাখতে এমন ছোট অভ্যাসই অনেক শক্তি দেয়।
ব্যস্ত জীবনে স্বাস্থ্য রক্ষা কঠিন নয় দরকার সামান্য সচেতনতা ও ধারাবাহিকতা। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় পানি, হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মানসিক বিশ্রামের মতো সহজ অভ্যাস যোগ করলে শরীর-মনের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণে। তাই ব্যস্ততার অজুহাত না দিয়ে আজ থেকেই শুরু হোক ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার বড় যাত্রা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন