মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণগুলোর একটি হলো বাত ও ব্যথা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা জীবনযাত্রার ভুল অভ্যাসের কারণে অনেকেই এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। তবে বর্তমানে অল্প বয়সীরাও বাত ও ব্যথাজনিত সমস্যায় ভুগছেন। সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা ও চিকিৎসার মাধ্যমে এ সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বাত কী? বাত মূলত এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা শরীরের অস্থিসন্ধি, পেশি, লিগামেন্ট ও টেনডনকে প্রভাবিত করে। বাত হলে সাধারণত অস্থিসন্ধিতে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন সৃষ্টি হয়, ফলে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাচলে অসুবিধা দেখা দেয়। বাত শুধু একটি রোগ নয়, এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।
বাতের প্রকারভেদ সবচেয়ে সাধারণ বাত হলো অস্টিওআর্থ্রাইটিস। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্থিসন্ধির কার্টিলেজ ক্ষয় হয়ে এ ধরনের বাত দেখা দেয়, যা হাঁটু, কোমর ও হাতের আঙুলে বেশি হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজ অস্থিসন্ধিকে আক্রমণ করে। এতে তীব্র ব্যথা ও স্থায়ী বিকলতা হতে পারে। রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে গাউট বা ইউরিক অ্যাসিডজনিত বাত হয়। এতে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা, লালচে ভাব ও ফোলা দেখা দেয়, বিশেষ করে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে। এছাড়া এনকাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস মূলত মেরুদণ্ডে আঘাত হানে এবং ধীরে ধীরে মেরুদণ্ড শক্ত করে ফেলে।
বাতের প্রধান লক্ষণ ও কারণ অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শরীর শক্ত লাগা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, নড়াচড়া করতে অসুবিধা, দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর বা দুর্বলতা বাতের প্রধান লক্ষণ। বাত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে, যেমন, বয়সজনিত পরিবর্তন, অতিরিক্ত ওজন, বংশগত কারণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দীর্ঘদিন একই ভঙ্গিতে কাজ করা, শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি এবং ধূমপান ও মদ্যপান।
বাত ব্যথা হলে করণীয় বাত ব্যথা শুরু হলে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক ব্যবস্থা নিলে জটিলতা অনেকটাই কমানো যায়। বাতের ধরন নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসক ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ফিজিওথেরাপি বাত রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী কারণ সঠিক ব্যায়াম জয়েন্টকে সচল রাখে এবং ব্যথা কমায়। অতিরিক্ত চাপ পড়লে ব্যথা বাড়ে, তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপায় চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যথা কমাতে সহায়ক। গরম সেঁক দিলে পেশি শিথিল হয়, হালকা ম্যাসাজ রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, হলুদ ও আদা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং পর্যাপ্ত পানি পান ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সহায়ক। এ ছাড়া ঠান্ডা পরিবেশে শরীর গরম রাখা জরুরি।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন বাত নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল, দুধ ও দুধজাত খাবার এবং সামুদ্রিক মাছ খাওয়া উচিত। তবে অতিরিক্ত লাল মাংস, ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। জীবনযাপনে পরিবর্তনের জন্য নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো প্রয়োজন।
বাত প্রতিরোধের উপায় পুরোপুরি বাত প্রতিরোধ সবসময় সম্ভব না হলেও নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং দীর্ঘক্ষণ এক ভঙ্গিতে না থাকার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। ছোটখাটো ব্যথাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বাত ও ব্যথা মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করলেও সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে এ রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। সুস্থ জীবনের জন্য দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং নিয়ম মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন