দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব এখন এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে, যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এই প্রাণঘাতী রোগের থাবায় আরও ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই শিশু। একই সময়ে সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৫২৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত নিয়মিত বুলেটিনে এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, বিশেষ করে দেশের নির্দিষ্ট কিছু জনপদে এর প্রকোপ এখন মহামারি পর্যায়ের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে সাতজনই শিশু। এই ১২ জনের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি হাম আক্রান্ত হয়ে এবং বাকি সাতজন হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের উপসর্গের মধ্যে তীব্র জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের কারণে শিশুদের অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটছে, যা পরবর্তীকালে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতায় রূপ নিয়ে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিভাগীয় সংক্রমণের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সিলেট ও ঢাকা বিভাগ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত একদিনে সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ ১৮২ জন এবং ঢাকা বিভাগে ১২২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বাকি আক্রান্তরা দেশের অন্যান্য বিভাগ থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের আটটি বিভাগের হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৪ জন শিশু বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবের বিগত ৫২ দিনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এক বীভৎস পরিসংখ্যান বেরিয়ে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই অল্প সময়ে হাম ও এর উপসর্গে দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩৬ জনে।
এই মৃত্যুর মিছিলের ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, ২৬৮ জন হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন কিন্তু ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়ার আগেই প্রাণ হারিয়েছেন। বাকি ৫৬ জনের শরীরে ল্যাবে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর হার এত বেশি হওয়া নির্দেশ করে যে রোগটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং আক্রান্তরা প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসা পাওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
সারাদেশে যখন আতঙ্কের পরিবেশ, তখন কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীরা। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৫৫ জন শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৪৪ হাজার ২৬০ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছেন।
তবে ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। বিশেষ করে শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা পেডিয়াট্রিক আইসিইউ এবং জেনারেল বেডগুলোর জন্য হাহাকার দেখা দিচ্ছে। ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত শিশু আসছে হামের লালচে দানা এবং তীব্র জ্বর নিয়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে টিকা দান কর্মসূচিতে কিছুটা স্থবিরতা বা নির্দিষ্ট এলাকায় টিকা বিমুখতা এই সংকটের মূলে থাকতে পারে। হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়। বাতাসের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এটি একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাধারণত হামের টিকা বা এমআর টিকা শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি কোনো শিশু এই ডোজগুলো মিস করে, তবে সে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বড়রাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা আগে খুব একটা দেখা যেত না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে দ্রুত বিশেষ কার্যক্রমের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুর গায়ে লালচে দানা দেখা দিলে তাকে দ্রুত অন্যদের থেকে আলাদা করা এবং স্কুলে পাঠানো বন্ধ করতে হবে।
আক্রান্ত শিশুদের প্রচুর পরিমাণে পানি, ফলের রস এবং ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বর ও শ্বাসকষ্টের তীব্রতা বাড়লে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকরা বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন যে, গ্রাম্য কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভর করা এই ক্ষেত্রে আত্মঘাতী হতে পারে।
হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররাও এগিয়ে এসেছেন জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে। তারা এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা শিশুদের সময়মতো টিকা দেন এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে লুকোছাপা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। খেলাধুলা বা উৎসবের চেয়ে শিশুদের জীবন রক্ষা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, এমন বার্তাই দিচ্ছেন দেশের তারকারা।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে ৩৩৬ জনের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এটি একদিকে যেমন টিকার গুরুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সিলেট ও ঢাকা বিভাগে যে উচ্চমাত্রার সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদি এখনই কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং টিকাদানের হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা না যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন এবং অভিভাবকদের সচেতনতাই পারে এই হামের প্রকোপ থেকে দেশকে রক্ষা করতে। সারা দেশের মানুষের এখন একটাই প্রার্থনা, মৃত্যুর এই মিছিল যেন দ্রুত থেমে যায় এবং দেশের প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
এম জি/জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন