দেশজুড়ে হামের তাণ্ডব, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
দেশজুড়ে হামের তাণ্ডব, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম এবং এর বিভিন্ন জটিল উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। হাসপাতালগুলোতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আশঙ্কাজনক শিশুর ভিড়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৭টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত কারণে মারা গেছে ৩টি শিশু এবং হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৪টি শিশু। এ নিয়ে গত দুই মাসে দেশে হামজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০০ এর কাছাকাছি পৌঁছেছে।

বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ ‘হাম ও এনসিডি নিয়ন্ত্রণ সেল’ থেকে প্রকাশিত নিয়মিত দৈনিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই ৭টি শিশুর মৃত্যু হয়। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১ হাজার ৪২৩ শিশুর শরীরে হামের তীব্র উপসর্গ-উচ্চ জ্বর, শরীরে লালচে র‍্যাশ, সর্দি-কাশি-দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ২৭৯ জনে।

এ ছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে আরও ২০৮ জন শিশুর শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবে মোট ৮ হাজার ২৭৫ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের কারণে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত তীব্র হাম ও এর জটিলতা-যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহ-নিয়ে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৪৬ হাজার ৪০৭ শিশু। হাসপাতালগুলোর শিশু আইসিইউ ও সাধারণ শয্যাগুলো রোগীর চাপে প্রায় পূর্ণ।

তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৬ হাজার ৪০৭ শিশুর মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪২ হাজার ৩৩৬ শিশু। বর্তমানে বাকিরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

গত দুই মাসেরও কম সময়ে দেশে হামের কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জটিলতায়-যেমন হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া ও পুষ্টিহীনতা-মারা গেছে ৪০৫ শিশু।

অন্যদিকে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং অন্যান্য ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হামজনিত কারণে মারা গেছে আরও ৮৩ শিশু। ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮৮ জনে। নিহত শিশুদের অধিকাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে এবং তারা দরিদ্র পরিবারের সন্তান।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) এর সাম্প্রতিক দুর্বলতা ও গাফিলতির কারণেই দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বিপুলসংখ্যক শিশু সময়মতো হামের প্রথম ডোজ (৯ মাস বয়সে) ও দ্বিতীয় ডোজ (১৫ মাস বয়সে) টিকা পায়নি। এর ফলে শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার হার বেশি হওয়ায় তাদের শরীরে হাম দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসটি ফুসফুস ও মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটিয়ে মারাত্মক নিউমোনিয়া তৈরি করছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও উপজেলায় বিশেষ জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কোনো শিশুর শরীরে উচ্চ জ্বরের পাশাপাশি লালচে র‍্যাশ দেখা দিলে দ্রুত তাকে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং পুষ্টিকর খাবার ও মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত দেশব্যাপী গণটিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

এম জি