জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২৫, ০৬:১৫ পিএম
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষে পূর্ণ হবে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদটিতে কে বসবেন তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। 

নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ ইতোমধ্যে নতুন প্রার্থীর মনোনয়ন আহ্বান করেছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। নির্বাচিত প্রার্থী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে পরবর্তী পাঁচ বছর জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেবেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন মূলত নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়। ২৫ নভেম্বর এই দুই অঙ্গের সভাপতিরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন আহ্বান করেন। যে কোনো রাষ্ট্র তাদের পছন্দের প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব করতে পারে।

প্রথাগতভাবে জাতিসংঘে ভৌগোলিক অঞ্চল ধরে মহাসচিব নির্বাচন হয়। যদিও কঠোর কোনো নিয়ম নেই, রীতিগতভাবে প্রত্যেক অঞ্চল পর্যায়ক্রমে সুযোগ পায়। ২০১৬ সালে গুতেরেস নির্বাচিত হওয়ার সময় পূর্ব ইউরোপের পালা থাকলেও এবার লাতিন আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ধারণা করছে। তবে অন্য অঞ্চল থেকেও প্রার্থী আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে ইতোমধ্যেই তার দেশের আনুষ্ঠানিক সমর্থন পেয়েছেন। দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতি, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার এবং ইউএন উইমেনের প্রথম নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ব্যাশেলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে লাতিন ব্লকের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী করে তুলেছে। মানবাধিকার, নারীর ক্ষমায়ন এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় তিনি অন্যদের থেকে এগিয়ে। কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান ইউএনসিটিএড মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যানও প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পাচ্ছেন। উন্নয়ন অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং বহুস্তরীয় উন্নয়ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সুপরিচিত।

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি তার প্রার্থিতা অনেক আগেই ঘোষণা করেছেন। বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থায় তার ভূমিকা বৈশ্বিক দৃশ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আরও কয়েকজন প্রার্থীর নাম আলোচনা হচ্ছে। আলিসিয়া বার্সেনা পরিবেশ, জলবায়ু নীতি এবং লাতিন আমেরিকার অর্থনৈতিক কমিশনে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। জেসিন্ডা আরডার্ন বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা, মানবিক নেতৃত্বের ধরন এবং শান্তিকেন্দ্রিক অবস্থানের কারণে পশ্চিমা ব্লক সমর্থন পেতে পারেন। ডেভিড চোকেউয়াঙ্কা আদিবাসী রাজনীতির প্রতিনিধি এবং গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন পেতে পারেন। মারিয়া ফার্নান্ডা এস্পিনোসা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম লাতিন নারী সভাপতি হিসেবে তার অভিজ্ঞতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ইইউ-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছে। ভুক ইয়েরেমিচ, আমিনা মোহাম্মদ এবং মিয়া মটলিও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মহাসচিব নির্বাচনের প্রথম ধাপ নিরাপত্তা পরিষদে অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ সদস্যের এই সংস্থা স্ট্র পোল নামে একাধিক গোপন ব্যালট পরিচালনা করে। প্রতিটি প্রার্থীর জন্য ভোট হয় সমর্থন, অসম্মতি অথবা মত নেই। এই ব্যালটে পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধার রাষ্ট্রের ব্যালট থাকে আলাদা রঙের। ফলে কোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন দেশ আপত্তি করেছে তা সহজেই বোঝা যায়। কোনো প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করার আগে পাঁচ ভেটো সদস্যের একইসাথে সমর্থন থাকা আবশ্যক। ২০১৬ সালে গুতেরেস নির্বাচিত হতে ছয় দফা স্ট্র পোল পরিচালনা করতে হয়েছিল। নিরাপত্তা পরিষদ একমত হলে প্রার্থীকে সাধারণ পরিষদে পাঠানো হয়। ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদ সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশেই অনুমোদন দেয়।

দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবে সমালোচনা করা হয়ে আসছে। তবে ২০২৫ সালের সাধারণ পরিষদে গৃহীত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বচ্ছতা বাড়াতে কিছু নতুন শর্ত যোগ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রার্থীকে ভিশন স্টেটমেন্ট প্রকাশ করতে হবে। মনোনয়ন পাওয়ার পর সেটি জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। সকল প্রার্থীকে তাদের নির্বাচনী তহবিলের উৎস জানাতে হবে। যারা বর্তমানে জাতিসংঘে কোনো পদে আছেন তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি নিতে হবে। এই পরিবর্তনগুলো নির্বাচনের স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রার্থীদের নৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০ বছরে কোনো নারী মহাসচিব নির্বাচিত হয়নি। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক চাপ এবং সমতার দাবি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নারী এখনো মহাসচিব হননি, তাই সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নারীদের মনোনয়ন দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অন্তত ৮–৯ জন নারী প্রার্থী আলোচনায় রয়েছে, তাই এবার লিঙ্গ সমতার নতুন ইতিহাস হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন কেবল ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার ব্যাপার নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, ভূরাজনীতি, উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত, শরণার্থী সংকট এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এই বিশাল চ্যালেঞ্জের যুগে নতুন মহাসচিবের কাঁধে দায়িত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কে হবেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংস্থার পরবর্তী নেতা সেটিই আগামীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন।

ইএইচ