বারামতি ট্র্যাজেডি

‘অন্যের ডিউটি’ পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারালেন অভিজ্ঞ পাইলট সুমিত কাপুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
‘অন্যের ডিউটি’ পালন করতে গিয়েই প্রাণ হারালেন অভিজ্ঞ পাইলট সুমিত কাপুর

জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান কখনো কখনো সামান্য এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। ভারতের মহারাষ্ট্রের বারামতিতে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুরের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল ঠিক তেমনটিই। 

দিল্লিতে সুমিতের শেষকৃত্যের সময় তার সহকর্মী ও বন্ধুরা দাবি করেছেন, দুর্ঘটনার দিন ওই বিশেষ ফ্লাইটটি পরিচালনার দায়িত্ব সুমিতের ছিল না। একজন সহকর্মী পাইলট রাস্তায় ভয়াবহ যানজটে আটকে পড়ার কারণে শেষ মুহূর্তে বদলি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সুমিত। আর সেই বদলি দায়িত্বই তার জীবনের শেষ ফ্লাইটে পরিণত হলো।

দিল্লিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভিএসআর ভেঞ্চারস এ কর্মরত সুমিত কাপুর মাত্র কয়েক দিন আগেই হংকং থেকে ফিরেছিলেন। 

বন্ধুদের দেওয়া তথ্যমতে, ২৮ জানুয়ারি সকালে অজিত পাওয়ারকে মুম্বাই থেকে বারামতিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য একজন পাইলট নির্ধারিত ছিলেন। কিন্তু সেই পাইলট সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারায় কর্তৃপক্ষ সুমিতকে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করে। 

অভিজ্ঞ ও পেশাদার হিসেবে সুমিত সেই অনুরোধ ফেরাতে পারেননি। সকাল ৮টার দিকে তিনি লিয়ারজেট ৪৫ উড়োজাহাজটি নিয়ে আকাশপথে উড়াল দেন।

উড়োজাহাজটিতে অজিত পাওয়ার ছাড়াও ছিলেন সহ পাইলট শম্ভবী পাঠক, বিমানবালা পিংকি মালি এবং নিরাপত্তারক্ষী বিদিপ যাদব। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বারামতি বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় দ্বিতীয় দফার প্রচেষ্টায় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। 

মর্মান্তিক এ ঘটনায় বিমানে থাকা পাঁচজনই ঘটনাস্থলে নিহত হন। সুমিতের বন্ধু শচীন তানেজা অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, দুর্ঘটনার পর শরীর এতটা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, হাতের ব্রেসলেট দেখে তাকে শনাক্ত করতে হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলো প্রাথমিক প্রতিবেদনে কুয়াশা এবং দৃশ্যমানতা কম থাকাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলটের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত এ পরিণতির জন্য দায়ী। তবে সুমিতের দীর্ঘদিনের বন্ধুরা এ পাইলট এরর বা ভুল সিদ্ধান্তের তত্ত্ব মেনে নিতে নারাজ। 

তাদের দাবি, সুমিত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও অভিজ্ঞ একজন বৈমানিক ছিলেন। কুয়াশায় উড়োজাহাজ চালানোর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা তার ছিল। তাই তারা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্তর্ঘাত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।

সুমিত কাপুর কেবল একজন পাইলটই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি বৈমানিক পরিবারের কাণ্ডারি। তার ছেলে এবং মেয়েজামাই, উভয়েই পেশাদার পাইলট। আকাশ জয় করাই ছিল তাদের বংশগত ঐতিহ্য। বড় ভাই গুরগাঁওয়ে ব্যবসা করেন। 

তার বন্ধু জিএস গ্রোভার স্মৃতিচারণা করে বলেন, সুমিত সবসময় মানুষের কথা ভাবত। হংকং থেকে ফিরে শেষ আড্ডায় আমাকে বলেছিল নিজের শরীরের খেয়াল রাখতে। অথচ কে জানত সেই ছিল ওর সাথে আমার শেষ কথা।

বারামতি বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ থেকে ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে সুমিতের শেষ কথোপকথন কী ছিল। দৃশ্যমানতা কম থাকা সত্ত্বেও কেন দ্বিতীয়বার অবতরণের ঝুঁকি নেওয়া হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। 

অজিত পাওয়ারের মৃত্যুতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে যেমন বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তেমনি ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুরের আকস্মিক বিদায় দেশের এভিয়েশন সেক্টরে এক অভিজ্ঞ নক্ষত্রকে কেড়ে নিয়েছে। অন্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে জীবন দেওয়ার এ ঘটনা সুমিতের পেশাদারিত্বের এক চরম নিদর্শন হয়ে থাকবে, তবে তার বন্ধুদের হৃদয়ে এ আক্ষেপ আজীবন রয়ে যাবে, যদি সেদিন অন্য পাইলটটি জ্যামে না পড়তেন।