মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টা

খামেনির প্রয়াণ ও ইরানের সামরিক নেতৃত্বের পতন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ১, ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
খামেনির প্রয়াণ ও ইরানের সামরিক নেতৃত্বের পতন

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক প্রলয়ঙ্কারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নজিরবিহীন সামরিক সংঘাতের ফলে বদলে গেছে ইরানের চার দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরান শাসন করা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে নিজ কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় শাহাদাত বরণ করেছেন। 

রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি এবং আল-জাজিরা এই খবর নিশ্চিত করার পর বিশ্বজুড়ে শোক ও আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে।

কেবল খামেনিই নন, এই হামলায় ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর শীর্ষ স্তম্ভগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা 'ইরনা' নিশ্চিত করেছে যে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুল রহিম মুসাভি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ একই অভিযানে নিহত হয়েছেন।

১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণকারী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। শনিবার সকালে তেহরানের অতি-সুরক্ষিত 'লিডারশিপ হাউস কমপাউন্ড'-এ যখন তিনি দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই ইসরায়েলি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র সেখানে আঘাত হানে।

বিবিসি ভেরিফাই ও স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, খামেনির কার্যালয় চত্বরের একটি বড় অংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। খামেনির মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ৭ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ইরাকেও তিন দিনের শোক পালিত হচ্ছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ‘কেবল প্রতীকী ছিল না, বরং এটি ছিল ইরানের নীতিনির্ধারণী স্তরকে নির্মূল করার একটি মহাপরিকল্পনা। 

হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুল রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, খামেনির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার-ইন-চিফ মোহাম্মদ পাকপুর হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন বলে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে। 

সিবিএস নিউজের তথ্যমতে, বিভিন্ন স্থানে চালানো এই অভিযানে ইরানের প্রায় ৪০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' হ্যান্ডেলে খামেনিকে "ইতিহাসের অন্যতম মন্দ ব্যক্তি‘হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটি ইরানের জনগণের জন্য দেশ পুনরুদ্ধারের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। তবে ইরান যখন পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছে, তখন ট্রাম্প আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলে হামলা করা হলে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করব, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর আইআরজিসি দমে যায়নি। তারা ঘোষণা করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে।

কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ৬৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে ইরান। দোহায় দফায় দফায় বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন ১৬ জন। আবুধাবি বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন। দুবাইয়ের আইকনিক 'বুর্জ আল আরব' হোটেলের কাছেও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং ইরাকের আল-হারির বিমানঘাঁটিতেও ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে। তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত এবং অন্তত ২১ জন আহত হয়েছেন।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি ফুটে উঠেছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরে। সেখানে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনায় পুরো বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই হামলাকে "আন্তর্জাতিক আইনের নজিরবিহীন লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন।

ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আইআরজিসি এই প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেবে।

খামেনি পরবর্তী সময়ে ইরানকে গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে একটি তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। এই পর্ষদে রয়েছেন দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট (মাসুদ পেজেশকিয়ান), বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরি। এই পর্ষদই সাময়িকভাবে দেশের প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিউইয়র্কে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই সামরিক পদক্ষেপ এমন এক ধারাবাহিক ঘটনার সূচনা করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

এএন