আজকের বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জয়গান, অন্যদিকে আদিম হিংস্রতায় মেতে ওঠা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানদের ইগো বা দম্ভ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বজুড়ে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তা গত কয়েক দশকের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। শান্তি চাই, যুদ্ধ নয়, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের এই আর্তনাদ আজ কামানের গর্জন আর ড্রোনের শব্দের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই আমেরিকা ফার্স্ট বা আমেরিকাই প্রথম, এই দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই নীতি আমেরিকা একাই শ্রেষ্ঠ এবং অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করো, এই আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই আগুন জ্বালানোর নেপথ্যে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, চীন এবং রাশিয়ার উত্থানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের একক রাজত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় একমেরু বিশ্বের আধিপত্য ধরে রাখা।
দ্বিতীয়ত, পেট্রো ডলার ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে ইরানকে চাপে রেখে বিশ্বের তেলের বাজার নিজেদের দখলে রাখা। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে এবং কট্টরপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে ট্রাম্প সবসময়ই একজন বাইরের শত্রু তৈরি করেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বা তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার যে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে প্রতিপক্ষ দেশের প্রধানকে সরিয়ে দিলে সেই দেশের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজেদের পছন্দের পুতুল সরকার বসাতে পারবে। এতে কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে তাঁর ধারণা। তবে বাস্তবে এটি একটি আত্মঘাতী পথ। একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা বা উৎখাতের চেষ্টা সেই দেশের সাধারণ মানুষকে আরও বেশি উগ্র ও প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দিলে সেখানে জন্ম নেয় উগ্রবাদ এবং দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতিতে কার লাভ আর কার ক্ষতি হচ্ছে তার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এর ফলে অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে বিলিয়ন ডলার আয় হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। ভূ রাজনৈতিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও মিত্রদের একচ্ছত্র প্রাধান্য তৈরি হলেও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলীন হচ্ছে ও শরণার্থী সংকট বাড়ছে। সামরিকভাবে নতুন যুদ্ধাস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হলেও লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা চললেও বিশ্বজুড়ে ঘৃণা, জাতিবিদ্বেষ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আজকের সংবাদ শিরোনামগুলো খেয়াল করলে দেখা যায় যে একদিনেই ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলের বিমানবন্দরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে এবং লোহিত সাগরে আটকা পড়েছে অসংখ্য পণ্যবাহী জাহাজ। এই পরিস্থিতির অর্থ হলো সাধারণ মানুষ আজ কোথাও নিরাপদ নয়। ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ঠেকাতে ৪০ লাখ ডলারের রকেট খরচ করা হচ্ছে, অথচ এই বিপুল অর্থ যদি দারিদ্র্য বিমোচন বা জলবায়ু পরিবর্তনে খরচ হতো তবে পৃথিবী আজ জান্নাত হতে পারত।
মানুষ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। এই নরক থেকে উত্তরণের জন্য বহুপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে এবং জাতিসংঘকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যেমনটি দেখা গেছে সাবেক মার্কিন মেরিন সেনা ব্রায়ান ম্যাকগিনিসের প্রতিবাদে। বিশ্ব নেতাদের রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে মানবিক মূল্যবোধকে উপরে স্থান দিতে হবে এবং মারণাস্ত্র তৈরির অর্থ কৃষি ও চিকিৎসায় বিনিয়োগ করতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বা যেকোনো বিশ্ব নেতার মনে রাখা উচিত যে ইতিহাস কোনো ধ্বংসকারীকে মনে রাখে না, মনে রাখে শান্তিকামী মানুষদের। ক্ষমতার লড়াইয়ে জিতে হয়তো কয়েক বছরের জন্য রাজা হওয়া যায়, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের অভিশাপ নিয়ে কোনো সাম্রাজ্যই টিকে থাকেনি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন