মধ্যপ্রাচ্যে মহাপ্রলয়ের পদধ্বনি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব
ইরানের অভিজাত বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের প্যারেডফাইল ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ ছাপিয়ে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন এক সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। 

সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী, ইরান তার চিরশত্রু ইসরায়েল এবং তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘চরম, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক’ পাল্টা হামলা চালানোর চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই দুই রাষ্ট্রকে তাদের সাম্প্রতিক ‘আগ্রাসনের’ জন্য এমন মূল্য চোকাতে হবে যা তারা কল্পনাও করেনি।

ইরানি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক মুখপাত্র আজ এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ইরানের যেসব স্থানে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো কৌশলগতভাবে ‘গুরুত্বহীন’। ইরানের দাবি, তাদের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি এবং অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি সম্পর্কে পেন্টাগন বা মোসাদের কাছে কোনো সঠিক তথ্য নেই।

ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম ও ফারস প্রকাশিত সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষ মনে করছে তারা আমাদের দুর্বল করে দিয়েছে, কিন্তু তারা মূলত অন্ধের মতো লক্ষ্যহীন আঘাত করছে। আমাদের হাতে থাকা তুরুপের তাসগুলো যখন উন্মোচিত হবে, তখন ইসরায়েল নামক মানচিত্রের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
ট্রাম্পের ‘দুই-তিন সপ্তাহ’ থিওরি ও মার্কিন তৎপরতা

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রেখেছেন। ফ্লোরিডায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেছেন, ইরান বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, "আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানা হবে এবং এই সময়ের মধ্যেই আমরা এই অভিযানের একটি যৌক্তিক সমাপ্তি দেখব।

তবে ট্রাম্পের এই রণকৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর চাক শুমার। তিনি মনে করছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া ইরানকে উসকানি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। এরই মধ্যে ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় হামলার তথ্য দিতে ৩০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন, যা ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তাহীনতাকেই স্পষ্ট করে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব বাণিজ্যে। ইরান ও তার মিত্র হুতি বিদ্রোহীরা যৌথভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দুটি নৌপথ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্ট ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বিদেশি জাহাজগুলোর ওপর ‘টোল’ আদায়ের একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘শত্রু দেশের’ কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে। ফিলিপাইন ও মিসরের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে জরুরি অবস্থা ও শপিং মল বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।

গত কয়েক দিনের যুদ্ধের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংঘাত আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই:

১. ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্ত: হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় ইসরায়েলের ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আইডিএফ (IDF) স্বীকার করেছে যে, লেবানন সীমান্তে তাদের অন্তত ৪৮ জন সেনা গত ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছে। হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে এখন নিয়মিত সাইরেন বাজছে।

২. ইরাক ও কুয়েত: ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দাবি করেছে তারা গত একদিনে মার্কিন ঘাঁটিতে অন্তত ২৩ বার হামলা চালিয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে ভয়াবহ আগুন লেগেছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

৩. ইরানের অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতি: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, তারা ইরানের নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্র এবং ইসফাহানের গোলাবারুদ ডিপোতে ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে। যদিও ইরান দাবি করছে, তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২০৪ জন শিশু নিহত হয়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তির আলো খোঁজার চেষ্টা করছে পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইসলামাবাদে ইতিমধ্যে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাশিয়া ও চীন এই সংকটে সরাসরি ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তেহরানকে ‘একনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জার্মানি অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া ইরানকে ড্রোন ও স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে সহায়তা করছে যাতে তারা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আর কোনো ছোটখাটো সংঘর্ষ নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা অবস্থাতেই ইরানের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে চায়। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তারা অন্তত ছয় মাস এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো রসদ ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল যদি এখনই থামানো না যায়, তবে এর প্রভাব কেবল ওই অঞ্চলের মানচিত্র পরিবর্তন করবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। ট্রাম্পের ‘১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব’ ইরান ইতিমধ্যে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে আলোচনার টেবিলের চেয়ে যুদ্ধের ময়দানই এখন বেশি উত্তপ্ত।

ইরান তার ‘সর্বাত্মক ধ্বংসাত্মক’ হামলার যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তা যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’ কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে আগামী ৪৮ ঘণ্টার দিকে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এএন