মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগর এখন এক বিশাল বারুদের স্তূপ, যার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ স্নায়ুযুদ্ধ। দীর্ঘ উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এই জলপথের দরজা চিরতরে বা দীর্ঘমেয়াদে সংকুচিত হয়ে আসছে।
রোববার আইআরজিসি নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে এই কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘পুরো উড়িয়ে দেওয়ার’ সরাসরি হুমকি দিয়েছেন।
আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ইরান এখন ‘নতুন ব্যবস্থা’ কার্যকর করার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটিতে ইতিমধ্যে একটি খসড়া আইন অনুমোদিত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি বিদেশি জাহাজকে ইরানকে ‘ট্রানজিট ফি’ বা যাতায়াত শুল্ক দিতে হবে। আন্তর্জাতিক জলসীমার প্রচলিত নিয়মের বাইরে ইরানের এই পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইআরজিসি এখন সামরিক প্রস্তুতির ‘চূড়ান্ত ধাপে’ রয়েছে। অর্থাৎ, কোনো জাহাজ যদি ইরানের শর্ত না মানে বা শুল্ক দিতে অস্বীকার করে, তবে তা সরাসরি সামরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিহত করা হবে।
ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে একের পর এক হুমকি দিয়ে চলেছেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সরাসরি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, মঙ্গলবার হবে ইরানে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’ (বিদ্যুৎকেন্দ্র দিবস) এবং ‘ব্রিজ ডে’ (সেতু দিবস)। সব একসাথেই ঘটবে। মঙ্গলবার, পূর্ব উপকূলীয় সময় রাত ৮টা!
এই পোস্টের মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, যদি ইরান তাঁর দেওয়া আলটিমেটাম মেনে না নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর (সেতু) ওপর আঘাত হানবে। শুধু তাই নয়, এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও ভয়াবহ মন্তব্য করে বলেছেন, চুক্তি না হলে তিনি পুরো ইরানকেই ‘উড়িয়ে দেবেন’।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার প্রভাব কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান উপকূলের সাম্প্রতিক চিত্রে। গত ১১ মার্চ এপি-র তোলা ছবিতে দেখা গেছে, শত শত তেলবাহী ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজ সাগরের মাঝখানে স্থবির হয়ে পড়ে আছে।
বিশ্বের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। এটি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া। বর্তমানে ৩ হাজারেরও বেশি জাহাজ এই এলাকায় আটকা পড়ে আছে, যার ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ট্রাম্পের এই ‘অশালীন’ এবং ‘বিধ্বংসী’ হুমকির তীব্র সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্বনেতারা। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আলটিমেটামের ভাষা’ পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। ল্যাভরভ বলেন, এ ধরনের ভাষা ব্যবহার কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। ওয়াশিংটনের উচিত সংঘাত না বাড়িয়ে আলোচনার টেবিলে আসা।
রাশিয়ার মতে, ট্রাম্পের এই আচরণ মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে চীনও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সামরিক পথে নয়, বরং দ্রুত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ খুঁজতে হবে।
মজিদ খাদেমি নিহতের পর ইরান এখন মানসিকভাবে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থানে। তাদের কাছে হরমুজ প্রণালি হলো শেষ অস্ত্র। ইরান জানে যে এই জলপথ বন্ধ করে দিলে পশ্চিমাবিশ্ব ও ইসরায়েলের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘Maximum Pressure’ নীতিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছেন। তাঁর উদ্দেশ্য হলো ইরানকে এমনভাবে চাপে ফেলা যাতে তারা সম্পূর্ণ নতি স্বীকার করে। কিন্তু ইরানের আইআরজিসি-র বিবৃতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে যে, তারা পিছু হটার বদলে সম্মুখ সমরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পুরো বিশ্ব এখন আগামী মঙ্গলবারের দিকে তাকিয়ে আছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী মঙ্গলবার রাত ৮টায় (মার্কিন সময়) কি সত্যিই কোনো বড় ধরনের হামলা ঘটবে? নাকি এটি কেবল আলোচনার টেবিলে ইরানকে নমনীয় করার একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ?
ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য হরমুজ প্রণালি আর কখনোই ‘স্বাভাবিক’ হবে না। এই ‘নতুন ব্যবস্থা’ যদি স্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্র চিরতরে বদলে যেতে পারে। শান্তির জন্য ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’-এর মতো প্রস্তাবগুলো যখন সামনে আসছে, তখন ট্রাম্পের ‘ব্রিজ ডে’ বা ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে’-র হুমকি সেই শান্তির পথকে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে।
পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অগ্নিপরীক্ষা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন