পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি বিবি আসিফা কি নির্দেশ করলেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি বিবি আসিফা কি নির্দেশ করলেন

পাকিস্তানের ফার্স্ট লেডি বিবি আসিফা ভুট্টো জারদারি দেশজুড়ে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় পোলিও টিকাদান কর্মসূচির প্রাক্কালে দেশের সকল পরিবার ও সম্প্রদায়ের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি শিশুকে এই পঙ্গুত্ব সৃষ্টিকারী রোগ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

এই দেশব্যাপী অভিযানের আওতায় পাকিস্তানের সকল প্রদেশ ও অঞ্চলের পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পোলিও নির্মূলে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে।

রবিবার এক বিবৃতিতে আসিফা ভুট্টো জারদারি বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে দেশ আজ পোলিও নির্মূলের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে। 

বর্তমান পর্যায়টিকে তিনি চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই সময়ে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো অপরিহার্য। আসিফা বলেন, আমরা লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছে। এখন আমাদের একটুও শিথিল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি পরিবারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের সন্তান এই জীবন রক্ষাকারী টিকা পায়।

১৩ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী এই অভিযানে ২ লাখের বেশি সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োজিত থাকবেন। তারা পাকিস্তানের বড় শহরগুলো থেকে শুরু করে দুর্গম পল্লী এলাকা পর্যন্ত প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের টিকা দেবেন।

শিশুদের পোলিও ড্রপ খাওয়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ শারীরিক বিকাশের জন্য ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টও প্রদান করা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিকূল পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করে প্রতিটি দুয়ারে কড়া নাড়বেন। তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমকে আসিফা ভুট্টো বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।

ফার্স্ট লেডি গত কয়েক বছরের অগ্রগতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৩১টি পোলিও কেস শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৬ সালের এই সময় পর্যন্ত মাত্র একটি কেস রেকর্ড করা হয়েছে। 

পরিসংখ্যানটি আশাব্যঞ্জক হলেও তিনি সতর্ক করে বলেন যে, ভাইরাসের ঝুঁকি এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি শিশুও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পুরো দেশের শিশুরা বিপদমুক্ত নয়। তিনি অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান, শুধুমাত্র বিশেষ ক্যাম্পেইন নয়, বরং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমেও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

পোলিও ভাইরাস নির্মূলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যৌথভাবে কাজ করছে। এবারের অভিযানটি আফগানিস্তানের সাথে সমন্বয় করে পরিচালিত হবে, যাতে আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের পথ বন্ধ করা যায়। দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াতের কারণে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলায় এই সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

১৯৯৪ সাল থেকে পাকিস্তান পোলিও নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ১৯৯০ এর দশকে পাকিস্তানে বার্ষিক পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২০,০০০। ২০২৫ সালে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির ফলে এই সংখ্যা ৯৯.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩১ এ নেমে আসে। 

চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা হলো এই সংখ্যাটিকে শূন্যে নামিয়ে আনা। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালে পোলিও নির্মূল কার্যক্রমের অধীনে পাঁচটি দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল।

সামগ্রিকভাবে পোলিও সংক্রমণের হার ২০২৪ সালের তুলনায় কমলেও, সিন্ধু প্রদেশ এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে এখনও ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের প্রথম বন্য পোলিও ভাইরাস কেসটি সিন্ধুতে শনাক্ত হয়েছে, যা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পকেট এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।

পোলিও একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্থায়ী পক্ষাঘাত বা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এটি মূলত দূষিত খাবার, পানি বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। পোলিও ড্রপ বা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

বর্তমানে বিশ্বের ১৯৫টি দেশে, যার মধ্যে সকল মুসলিম প্রধান দেশ অন্তর্ভুক্ত, এই নিরাপদ ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্য পোলিও ভাইরাস হলো প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলা ভাইরাসের রূপ, যা নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

আসিফা ভুট্টো জারদারি তার বক্তব্যের শেষে দেশের সকল নাগরিক, ধর্মীয় নেতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পোলিওমুক্ত পাকিস্তান আমাদের সন্তানদের অধিকার। কোনো শিশু যেন টিকাদান থেকে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করা আমাদের সামষ্টিক দায়িত্ব। 

তিনি বিশ্বাস করেন যে, অভিভাবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় পাকিস্তান খুব শীঘ্রই পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নেবে। ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে কোনো গুজব বা ভুল তথ্যে কান না দিয়ে শিশুদের সুরক্ষিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

জেএইচআর