বিশ্ব ঐতিহ্যের সেই গ্রাম, যেখানে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র ২০ জন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক  প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
বিশ্ব ঐতিহ্যের সেই গ্রাম, যেখানে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র ২০ জন
ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো আধুনিকায়ন করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে সেগুলোকে অবশ্যই ওই স্থানের ‘অসাধারণ সর্বজনীন মূল্য’ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

মধ্য স্লোভাকিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত ‘ভলকোলিনেক’  নামের একটি ছোট্ট গ্রাম। এটি যেন মধ্যযুগীয় রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা এক ছবির মতো সুন্দর পল্লি, যেখানে মানুষের চেয়ে ঘরের সংখ্যাই বেশি। এখানকার মাত্র ২০ জন স্থায়ী বাসিন্দা বাস করেন ৪৫টি নজরকাড়া, উজ্জ্বল রঙের ঐতিহ্যবাহী কাঠের কুটিরে, যা গড়ে উঠেছে একটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ঘণ্টাঘরকে  কেন্দ্র করে।

ভলকোলিনেকের এই অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং অক্ষত ঐতিহ্যের কারণে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু এই স্বীকৃতির পর থেকেই চিত্রটা বদলে যায়। প্রতি বছর এই ছোট্ট গ্রামে প্রায় ১ লাখেরও বেশি পর্যটকের ঢল নামতে শুরু করে। 

সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দারা যুক্তি তুলছেন যে, এই তকমা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া লাগামহীন পর্যটন তাদের জীবনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে এবং উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে। তাই তারা এখন এই গ্রামটিকে ইউনেস্কোর তালিকা থেকে বাদ দিতে  চান।

আফ্রিকার অন্যতম সেরা ও বিশ্ববিখ্যাত সাফারি অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত। এখানে পর্যটকেরা আফ্রিকার বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ পান।

এখান থেকে প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার দূরে আফ্রিকার তানজানিয়ায়, ‘মাসাই ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি আদিবাসী সংগঠন বন্যপ্রাণীতে সমৃদ্ধ ‘এনগোরোনগোরো সংরক্ষণ অঞ্চল’ -কে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এই এলাকাটি যেমন পশুচারণকারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের আদিভিটা, তেমনি আফ্রিকার অন্যতম সেরা সাফারি অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু। 

কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এই অঞ্চলের জন্য যেসব সংরক্ষণ নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ফলে তারা নিজেদের পূর্বপুরুষের চারণভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন।

এই দুই প্রান্তের বিরোধ একটি বড় বিতর্ককে সামনে এনেছে: যখন সমগ্র মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থানকে রক্ষা করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ও স্বার্থের সংঘাত বাঁধে, তখন আসলে কী ঘটে?

ইউনেস্কোর ক্ষমতা ও ঐতিহ্যের বিবর্তন

বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বিশাল ও ক্রমবর্ধমান তালিকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ইউনেস্কোর একটি আন্তর্জাতিক কমিটি। ১৯৭৮ সালে মাত্র ১২টি স্থান নিয়ে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা আজ ২০২৬ সাল নাগাদ ১৭০টি দেশে ১,২৪৮টি সাইটে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে পেরুর মাচু পিচু বা চীনের মহাপ্রাচীরের মতো বিশ্বখ্যাত নিদর্শন, তেমনই রয়েছে রোমানিয়ার কাঠের তৈরি মারামুরেস গির্জা কিংবা মরক্কোর প্রাচীন মরূদ্যান বসতি আইত-বেন-হাদ্দুর মতো স্বল্পপরিচিত স্থান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিগ্রহ, শিল্পায়ন এবং আধুনিক উন্নয়নের থাবা থেকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল স্থানগুলোকে বাঁচানোর তাগিদ থেকেই এই তালিকার জন্ম হয়েছিল।

ভেনিস বর্তমানে ইউরোপের এমন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে পর্যটকের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেছে। ফলে শহরটি ওভারট্যুরিজমের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে।

ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষণ তহবিল পাওয়ার পথ সুগম করে, যার ফলে এটি ঐতিহ্য রক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। এর সমর্থকরা বেলিজ ব্যারিয়ার রিফ  রিজার্ভ সিস্টেমের উদাহরণ দেন, যা পরিবেশগত সুরক্ষা জোরদার করার পর ২০১৮ সালে ইউনেস্কোর "বিপন্ন' তালিকা থেকে মুক্তি পায়। আবার কম্বোডিয়ার আংকর ভাটের  কথাই ধরা যাক, যেখানে কয়েক দশকের পুনরুদ্ধার কাজ যুদ্ধ এবং লুটপাটে ধ্বংসপ্রায় একটি ঐতিহাসিক স্থানকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।

ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ডের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ জন এইচ স্টাবস বলেন, ইউনেস্কোর মূল দর্শনই হলো অংশীদারিত্বের ঐতিহ্য, একে রক্ষা করা, উদযাপন করা এবং মানবজাতির যৌথ অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

তবে বর্তমান যুগে এসে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান এই সমীকরণ অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি যেমন একটি স্থানকে রক্ষা করতে সাহায্য করছে, ঠিক তেমনই পর্যটনের জোয়ার এনে সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার পুরো খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।

সংস্কৃতি ও অতি-পর্যটন  গবেষক গ্রেগ রিচার্ডস ইউনেস্কোর এই মর্যাদাকে ভ্রমণ গাইডের 'স্টার রেটিং' এর সাথে তুলনা করেছেন, যা পর্যটকদের নির্দেশ করে যে কোন স্থানটি তাদের 'অবশ্যই দেখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, তালিকায় নাম ওঠার সবচেয়ে নিশ্চিত ফলাফল হলো- সেখানে পর্যটকদের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাওয়া।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখন এই বিষয়ে একমত তৈরি হয়েছে যে, ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হওয়ার পর অনেক রকম ফলাফল আসতে পারে, তবে একটি জিনিস একদম নিশ্চিতভাবে ঘটবে- তা হলো পর্যটকদের আগমন বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া।

সংরক্ষণ বনাম ‘মিউজিয়ামিফিকেশন’ বা জাদুঘরকরণ

ঐতিহাসিকভাবে ইউনেস্কোর সংরক্ষণ প্রচেষ্টা মূলত ভৌত কাঠামোর ওপর কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল- যেমন স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান বা স্থাপত্যশৈলীতে সমৃদ্ধ ভবন। কিন্তু বর্তমানের বহু ঐতিহ্যবাহী স্থানে মানুষ এখনো বংশপরম্পরায় বসবাস ও কাজকর্ম করে আসছেন।

১৯৮৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা পাওয়া ইতালির ভেনিস শহর এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় ‘ওভারট্যুরিজম’ বা অতি-পর্যটনের শিকার। পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দলে দলে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। 

চীনের লিজিয়াং শহরের ওল্ড টাউন এবং ওখানকার আদিবাসী ‘নাক্সি’  সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৭ সালে স্বীকৃতির পর পর্যটন এতটাই বেড়ে যায় যে, শহরের মূল কেন্দ্রটি গেস্টহাউস আর স্যুভেনির দোকানে ভরে গেছে, যা স্থানীয় জীবনযাত্রার মৌলিকত্বকে ফিকে করে দিয়েছে। 

মরক্কোর মারাকেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘মেদিনা’ এলাকায় পর্যটন এবং বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে সম্পত্তির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা স্থানীয়দের উচ্ছেদ করে এলাকাকে জেন্ট্রিফিকেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গবেষকরা এই প্রক্রিয়াকে বলছেন ‘মিউজিয়ামিফিকেশন’  বা ‘জাদুঘরকরণ’। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি জীবন্ত, সচল জনপদ ধীরে ধীরে তার বাসিন্দাদের বাদ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। 

অবশ্য অনেক ঐতিহাসিক শহর ইউনেস্কোর স্বীকৃতির অনেক আগে থেকেই আবাসন সংকট বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ভেনিসের মতো শহরগুলোর ক্ষেত্রে পর্যটন এই নেতিবাচক পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘খাঁটিত্ব’ বা ‘অথেনটিসিটি’  সংক্রান্ত ধারণার সংঘাত। রিচার্ডস বলেন, ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি একটি বিশাল বিতর্ক। 'অথেনটিসিটি' বা খাঁটিত্ব শব্দটি বেশ বিপজ্জনক, কারণ একেকজন একেকভাবে এর ব্যাখ্যা করতে পারেন।

তাঁর মতে, এক পক্ষ যাকে ঐতিহ্য রক্ষা করার খাঁটি প্রচেষ্টা মনে করছে, অন্য পক্ষ হয়তো তাকে কৃত্রিম পুনর্নির্মাণ হিসেবে দেখছে।

ইউনেস্কো সাইটগুলোর আধুনিকায়নে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে শর্ত হলো- যেকোনো নতুন উন্নয়ন যেন সাইটটির সেই মূল গুণটিকে নষ্ট না করে যার জন্য এটি স্বীকৃতি পেয়েছিল। বাস্তবে, এই নিয়মটি স্থানীয়দের আধুনিক আবাসন এবং পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার সাথে সংরক্ষণের এক বড় দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

পাশাপাশি টিকটক  বা ইনস্টাগ্রামের  মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো পর্যটনের এই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে মানুষ ভ্রমণ গাইড বা সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করত, আর এখন তারা অন্য পর্যটকদের রিল বা ছবি দেখে দলে দলে ছুটে যায়।

ইউনেস্কোর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর সীমাবদ্ধতা

ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা অবশ্য স্বীকার করছেন যে, বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো অতি-পর্যটনের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনেস্কোর টেকসই পর্যটন বিশেষজ্ঞ পিটার ডি ব্রাইন বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবেই স্বীকার করি যে গত ১০ থেকে ১৫ বছরে পর্যটনের ধরন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

ইউনেস্কোর ১,২৪৮টি বিশ্ব ঐতিহ্যস্থানের তালিকায় বিশ্বের বিস্ময়কর নিদর্শনগুলোর পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত অনেক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি জানান, ইউনেস্কো এখন যেকোনো স্থানকে তালিকাভুক্ত করার সময় একটি সুনির্দিষ্ট ‘ভিজিটর-ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ বা পর্যটক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করতে বলে, যাতে উপচে পড়া ভিড় সামলানো এবং সংবেদনশীল পরিবেশের ওপর চাপ কমানো যায়। 

তিনি আরও যোগ করেন, আমরা পর্যটনকে নিরুৎসাহিত করছি না। আমরা চাই পর্যটন যেন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করে। বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো পুরো মানবজাতির জন্য, আমরা চাই মানুষ সেখানে যাক এবং তা উপভোগ করুক।

এই পরিবর্তনটি ইউনেস্কোর নিজস্ব চিন্তাভাবনার এক ধরনের বিবর্তন। প্রথম দিকের নথিপত্রগুলোতে পর্যটনের কথা কেবল সংরক্ষণের ক্ষতির প্রসঙ্গে খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করা হতো। কিন্তু আজ ইউনেস্কো পর্যটনকে একই সাথে একটি চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে, যা সঠিকভাবে পরিচালনা করলে স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হলো, স্লোভাকিয়ার ভলকোলিনেক বা তানজানিয়ার মাসাই সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ও উদ্বেগ ইউনেস্কোর বর্তমান আইনি কাঠামোর বাইরে চলে গেছে। ইউনেস্কো একটি ভৌত কাঠামোর বা প্রকৃতির ক্ষতি মূল্যায়ন করতে পারে, কিন্তু যখন ঐতিহ্য সংরক্ষণের কারণে মানুষের জীবনের অধিকার বা জীবিকা বিঘ্নিত হয়, তখন ইউনেস্কোর করার কিছু থাকে না।

যখন পিটার ডি ব্রাইনকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, স্থানীয় বাসিন্দারা যদি মনে করেন পর্যটন বা সংরক্ষণ নীতি তাদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তবে ইউনেস্কো কি হস্তক্ষেপ করতে পারে? তিনি স্পষ্ট উত্তর দেন, আমাদের কাছে আসলে এর জন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা মেকানিজম নেই।

আর এই কারণেই, ভলকোলিনেক বা এনগোরোনগোরোর মাসাই সংগঠনের এত আকুতি সত্ত্বেও, ইউনেস্কোর আসন্ন অধিবেশনে এই সাইটগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইউনেস্কো কেবল তখনই কোনো স্থানকে ‘বিপন্ন’ ঘোষণা করতে পারে বা তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে, যখন সেটি যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন বা অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ে। কিন্তু পর্যটনের কারণে মানুষের যে সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে কাউকে বাদ দেওয়ার নিয়ম ইউনেস্কোর নেই।

যেভাবে ঐতিহ্যবাহী স্থানের তকমা হারায়

ইউনেস্কোর ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি সাইটকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিবারই মূল কারণ ছিল ভৌত পরিকাঠামো বা সংরক্ষণের অভাব। 

২০২১ যুক্তরাজ্যের লিভারপুল মেরিটাইম মার্চেন্টাইল সিটি, নদীর তীরবর্তী এলাকায় আধুনিক গগনচুম্বী ভবন ও স্টেডিয়াম নির্মাণের ফলে ঐতিহ্যের ক্ষতি হয়। মজার ব্যাপার হলো, ইউনেস্কোর তালিকা থেকে বাদ পড়ার পরেও এই স্থানগুলোতে পর্যটকদের আগমন কমেনি। 

সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ জন এইচ স্টাবস যুক্তি দেন যে, ভলকোলিনেক বা মাসাইদের এই প্রতিবাদের ফলে হয়তো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার নাম থেকে তারা এখনই মুক্তি পাবে না, তবে এটি একটি বড় বার্তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই দাবিগুলো অতি-পর্যটনের সমস্যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা ইতিবাচক।

তবে তিনি মনে করেন, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আসল সমাধান আসবে এমন এক সুস্মার্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ সংরক্ষণ পরিকল্পনা থেকে, যা শুধু ঐতিহাসিক ভবন বা বন্যপ্রাণী নয়- বরং সেই অঞ্চলের অর্থনীতি, অবস্থান এবং সর্বোপরি সেখানে বসবাসকারী রক্তমাংসের মানুষদের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

ইউনেস্কো তার প্রথম সাইটগুলো সংরক্ষণের পর আজ দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানের এই বিতর্কগুলো একটি রূঢ় সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে,একটি জড় ঐতিহাসিক স্থান বা স্থাপনাকে বাঁচানো আর সেখানে বসবাসরত একটি জীবন্ত মানব সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখা এক জিনিস নয়। আর দ্বিতীয় কাজটি প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও জটিল।

এএন