আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০২:০২ পিএম
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমার ধারা পুনরায় জোরালো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার এশিয়ার লেনদেনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার আদর্শ বা বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৯ শতাংশ কমেছে।

গ্রিনিচ মান সময় ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে দেখা যায়, আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৮ ডলার ৭ সেন্টে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। বর্তমান তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের মূল্যের চেয়ে মাত্র ৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, যুদ্ধের কারণে বাজারে তেলের দামের যে আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে আসছে।

এই দরপতনের ধারা অবশ্য গতকাল বুধবার সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি হুঁশিয়ারিমূলক বক্তব্যের পর বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৮১ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি এই চুক্তির পর ভালো আচরণ না করে বা শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র আবারও দেশটিতে কঠোর সামরিক অভিযান বা বোমা হামলা শুরু করতে দ্বিধা করবে না। এই সামরিক হুমকির কারণে বাজারে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হলেও, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার খবরে আজ তেলের দাম আবারও বড় ব্যবধানে কমেছে।

গত প্রায় চার মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এই চুক্তির ফলে তা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই প্রত্যাশায় এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং সূচকের ঐতিহাসিক উত্থান ঘটেছে।

জাপানের প্রধান শেয়ারসূচক নিক্কেই ২২৫ আজ নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সূচকটি এক দিনেই ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কোসপিও তার আগের সব রেকর্ড ভেঙে ১.৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তাইওয়ানের প্রধান শেয়ারবাজারের সূচক তাইএক্স সর্বোচ্চ ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড গড়েছে।

এশিয়ার প্রায় সব বাজারে উত্থান দেখা গেলেও এর ব্যতিক্রম ছিল হংকংয়ের বাজার। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচকটি আজ ১.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে এশিয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোতেও ইতিবাচক হাওয়া বইছে। মার্কিন শেয়ারবাজার আজ আনুষ্ঠানিকভাবে খোলার আগেই ফিউচার মার্কেটে সূচকের ঊর্ধ্বগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার এই অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল আলোচনা সফল করার পেছনে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। গতকাল বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো বিলম্ব ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিভিন্ন বন্দর ও সমুদ্রসীমার ওপর এতদিন ধরে আরোপিত কঠোর নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা এলেও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন রুটে জাহাজ চলাচল এখনই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কি না, তা নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে।

গত চার মাসের যুদ্ধে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন হামলা এবং সমুদ্রের তলদেশে মাইন পেতে রাখার হুমকির কারণে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এই রুট পরিহার করছিল। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার ফলে বর্তমানে ৫০০টিরও বেশি পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজ, এই প্রণালী পার হয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় আটকে পড়ে আছে।

যদিও দুই দেশ সামরিক উত্তেজনা কমানোর চুক্তি করেছে, তবুও আন্তর্জাতিক শিপিং ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। বিভিন্ন বৈশ্বিক জাহাজ পরিবহন সংস্থা ও নাবিক সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সাধারণ নাবিকদের নিরাপত্তার বাস্তব গ্যারান্টি কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো দুই দেশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বা সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন বা তথ্য দেওয়া হয়নি। সমুদ্রে পাতা মাইনগুলো কীভাবে অপসারণ করা হবে এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে কারা থাকবে, তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অনেক কোম্পানি এখনই এই রুটে বড় বিনিয়োগ বা জাহাজ পাঠাতে দ্বিধাবোধ করছে।

এই প্রাথমিক চুক্তিটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একটি বড় ধরনের মন্দার হাত থেকে রক্ষা করেছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হওয়ায় আগামী ৬০ দিনের ওপর বিশ্ববাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে।

জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তির খবর। এর ফলে আমেরিকা, ইউরোপসহ এশিয়ার দেশগুলোতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমবে, যা বিশ্বব্যাপী চলমান মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করবে।

আগামী দুই মাসের মধ্যে যদি মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা এই চুক্তিকে একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারেন, অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী যদি নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তবে শেয়ারবাজার এবং তেলের বাজার আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রাথমিক শান্তিচুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি তাৎক্ষণিক সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তেলের দাম কমে যাওয়া এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে রেকর্ড উত্থান তারই প্রমাণ। তবে হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সচল করা এবং ৫০০টিরও বেশি আটকে থাকা জাহাজকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোই এখন বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়ী পুনরুদ্ধার।

জেএইচআর