মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা। কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় এই দুই বৈরি দেশের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডের একটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে মুখোমুখি বৈঠকে বসেছে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো, চলমান ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করা।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনার সূচনার কথা ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই বৈঠককে গত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তিতে ঠিক কী রয়েছে এবং ইজরায়েল কি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ বা সাবোটাজ করতে পারে?
রোববার সকালে সুইজারল্যান্ডে এসে পৌঁছায় মার্কিন ও ইরানি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির মজলিসের বা সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর পর ইরানি প্রতিনিধি দল স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার প্রতিটি শর্ত যেন সব পক্ষ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে, তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক দল এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যেই উভয় পক্ষের সমন্বয়ে বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত এবং বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলো দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ এর সমস্ত দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে একটি চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা তৈরি করতে আলোচনা শুরু করেছে।
চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে প্রাথমিক বা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হয়েছে, তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্য থেকে চুক্তির মূল ভিত্তিগুলো স্পষ্ট হয়।
প্রথমত, অবরুদ্ধ ইরানি ফান্ড বা অর্থ মুক্তি। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক শর্ত হলো, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিশাল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়া। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের বার্তা সংস্থা তাসনিমকে নিশ্চিত করেছেন, কাতারের ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল এই প্রাথমিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে ফেরত দেওয়া হবে। এই অর্থ অবমুক্ত হওয়া ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তি।
দ্বিতীয়ত, তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করতে পারছিল না। নতুন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় তেল বিক্রির সুযোগ পাবে। এর বিনিময়ে ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির গতি সীমিত করতে হবে এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছু হটতে হবে।
তৃতীয়ত, লেবানন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। এই মুহূর্তে আলোচনার টেবিলের সবচেয়ে শীর্ষ এজেন্ডা হলো লেবাননে ইজরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ। ইরান যেহেতু হিজবুল্লাহর প্রধান পৃষ্ঠপোষক, তাই লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন-ইরান চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো লেবানন সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া এবং ইজরায়েলি বিমান হামলা বন্ধ করা।
মার্কিন-ইরান এই শান্তি আলোচনা যখন সুইজারল্যান্ডে পুরোদমে চলছে, তখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম তেল আবিব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর সংশয় রয়েছে যে, ইজরায়েল এই চুক্তিকে মেনে নেবে কি না, নাকি তারা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার চেষ্টা করবে।
ইজরায়েলের বর্তমান মনোভাব এই সংশয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সুইজারল্যান্ডে যখন আলোচনা শুরু হচ্ছে, ঠিক তখনই ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ইজরায়েল কাটজ একটি অত্যন্ত কঠোর ও উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলি সেনাদের ওপর বা দেশের নিরাপত্তার ওপর যেকোনো হুমকি মোকাবেলায় ইজরায়েলি সৈন্যদের অ্যাকশন বা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক বাধা মানা হবে না। তথাকথিত নিরাপত্তা বলয় বা সিকিউরিটি জোনে ইজরায়েলের আক্রমণাত্মক বাহিনী মোত্যেন থাকবে এবং তারা যেকোনো মুহূর্তে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
ইজরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে চুক্তি করলেও ইজরায়েল লেবাননে তার সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি নয়। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার মনে করে, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তা ইজরায়েলের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে, ইজরায়েল যেকোনো মুহূর্তে দক্ষিণ লেবাননে বা সরাসরি ইরানের ভেতরে কোনো সামরিক উস্কানি তৈরি করে এই কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে দিতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে যখন কূটনীতিকরা ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত, তখন মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে কিন্তু রক্তপাত থামেনি। আজ ২১ জুন, ২০২৬ দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর নাবাতিয়াহতে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার তীব্রতায় নাবাতিয়াহর প্রধান বাজারটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আজ সকালে সেখানে বড় বড় বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসাবশেষ এবং পাথরের স্তূপ সরাতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে।
একই সাথে গাজা উপত্যকাতেও ইজরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইজরায়েলি হামলায় অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ৪১ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই বাস্তব চিত্র প্রমাণ করে যে, সুইজারল্যান্ডের আলোচনা যত দ্রুত সম্ভব একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতিতে রূপ না নিলে মাঠপর্যায়ের মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার পেছনে কাতার এবং পাকিস্তান পর্দার আড়ালে এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি বিশ্বস্ত সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। এর আগে বন্দি বিনিময় এবং অর্থ ছাড়ের বিষয়েও কাতার সফল মধ্যস্থতা করেছিল।
অন্যদিকে, এই দফায় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি আলোচনাকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাকিস্তানের সাথে ইরানের দীর্ঘ স্থল সীমান্ত রয়েছে এবং একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও তাদের কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান। কাতার ও পাকিস্তানের এই যৌথ কূটনৈতিক চাপই মূলত ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধি দলকে সুইজারল্যান্ডে একই ছাদের নিচে বসাতে বাধ্য করেছে।
সুইজারল্যান্ডের এই আলোচনা সফল করতে হলে বিশেষজ্ঞদের বেশ কয়েকটি বড় বাধা পার হতে হবে।
প্রথম বাধা হলো পারমাণবিক ও সামরিক তদারকি। ইরান সত্যিই তার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকছে কি না, তা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ কীভাবে তদারকি করবে, তা নিয়ে মার্কিন দল অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
দ্বিতীয় বাধা হলো প্রক্সি গ্রুপ বা ছদ্মবেশী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ। কেবল হিজবুল্লাহ নয়, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ইরান কীভাবে লাগাম টানবে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি।
তৃতীয় বাধা হলো ইজরায়েলের ভেটো বা আপত্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে একদিকে ইজরায়েলি লবিকে শান্ত রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সাথে চুক্তি এগিয়ে নিতে হচ্ছে, যা এক বিরাট রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি।
সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে এই আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
পৃথিবীর চোখ এখন জেনেভার দিকে। মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধি দল কি পারবে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করতে, নাকি ইজরায়েলের সামরিক অনমনীয়তা এই শান্তি চুক্তিকে কেবলই একটি অধরা স্বপ্নে পরিণত করবে, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন