আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের চমক সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরান তার সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করেছে। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, এই ঐতিহাসিক ও বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি আগামীকালই কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক আকস্মিক বিবৃতিতে ট্রাম্প নিজেই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের বরফ গলাতে এই বৈঠক কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে।
আকস্মিক ঘোষণা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, তেহরান নিজেই এই আলোচনার জন্য প্রথম উদ্যোগ নিয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরান আমাদের কাছে বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে। তারা আলোচনা করতে চায় এবং একটি সমঝোতায় আসতে আগ্রহী। আমি সবসময়ই আলোচনার পক্ষে, যদি তা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে। আগামীকাল কাতারের দোহায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
তবে এই বৈঠকে ইরানের পক্ষ থেকে কে বা কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে খোলসা করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পর্যায়ের একটি দল ইতিমধ্যেই দোহার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কাতার
বিশ্বের বড় বড় ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিশ্বস্ত নাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান- উভয় দেশের সঙ্গেই কাতারের সুসম্পর্ক রয়েছে। অতীতেও ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে বন্দি বিনিময় এবং অবরুদ্ধ তহবিল ছাড়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দোহা সফলভাবে মধ্যস্থতা করেছে।
নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য দোহার চেয়ে উপযুক্ত স্থান এই মুহূর্তে খুব কমই ছিল। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দুই পক্ষকে সব ধরনের লজিস্টিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকের মূল এজেন্ডা কী হতে পারে?
যদিও হোয়াইট হাউস বা তেহরান- কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা প্রকাশ করেনি, তবুও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে আলোচনা মূলত কয়েকটি প্রধান বিষয়ের ওপর আবর্তিত হবে।
ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে নিয়েছিলেন এবং ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। ইরান চাইবে এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর অবসান ঘটাতে, যার ফলে তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন এবং গাজায় ইরানের প্রভাব এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি আমেরিকার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ট্রাম্প প্রশাসন চাইবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে একটি সীমারেখার মধ্যে নিয়ে আসতে।
ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নেওয়া হলে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। ট্রাম্পের ব্যবসায়ী সুলভ কূটনৈতিক কৌশলে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন স্বার্থরক্ষা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
এই বৈঠকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল এই বৈঠককে অত্যন্ত সতর্ক চোখে দেখছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বরাবরই ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের নমনীয় চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন। তেল আবিব চাইবে ট্রাম্প যেন ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের কৌশলগত অংশীদার চীন ও রাশিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা চায় মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরুক, তবে তা যেন মার্কিন একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার না হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনীতির ধরন সবসময়ই প্রথাগত নিয়মের বাইরে। তিনি "আর্ট অফ দ্য ডিল" বা চুক্তির শিল্পে বিশ্বাসী। উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে তার আকস্মিক শীর্ষ বৈঠকগুলোর কথা বিশ্ববাসী ভুলে যায়নি। তবে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শত্রুতার অবসান ঘটানো এত সহজ নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সবুজ সংকেত ছাড়া তেহরানের কোনো প্রতিনিধি দল মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হতে পারে না। তাই ধারণা করা হচ্ছে, পর্দার আড়ালে বেশ কিছুদিন ধরেই হয়তো দুই দেশের গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক চ্যানেলে বার্তা আদান-প্রদান চলছিল, যা এখন প্রকাশ্যে রূপ নিতে যাচ্ছে।
আগামীকালের দোহা বৈঠক যদি সফল হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আর যদি এটি কেবলই একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ বা ফটো-সেশনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। সারা বিশ্বের নজর এখন তাই কাতারের রাজধানী দোহার দিকে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন