যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষে থাকা এই নেতার শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। তবে এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে ঘিরে সাধারণ ইরানিদের একাংশের মধ্যে চরম অনীহা, ক্ষোভ ও নিরাপত্তা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে তেহরানের রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক কম। দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং ভিড় ও কঠোর নিরাপত্তা এড়াতে শহর ছাড়ছেন বহু মানুষ। ফলে তেহরান থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা কমপ্লেক্সে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে এবং প্রধান সড়কগুলোতে বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। ইরান সরকারের দাবি, এই শেষযাত্রায় প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সমাগম সফল করতে অন্য শহর থেকে বাসে করে সরকারি কর্মচারী ও স্কুলের শিশুদের তেহরানে আনা হচ্ছে।
সরকারের আয়োজন বনাম জনগণের ক্ষোভ: কেন এই অনীহা?
সব ইরানি যে এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সমানভাবে আবেগাপ্লুত, তা নয়। মাত্র ছয় মাস আগেই খামেনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে ইরানে বিশাল জনবিক্ষোভ হয়েছিল। বর্তমানে সাধারণ মানুষের এই অনীহার পেছনে প্রধানত কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে:
নিরাপত্তা আতঙ্ক ও অব্যবস্থাপনার ভয়: বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই অতিরিক্ত ভিড়ে পিষ্ট হয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন। পাশাপাশি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা আন্তর্জাতিক সহিংসতার ভয়ও তাঁদের তাড়া করছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও জাঁকজমকের বৈপরীত্য: দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও জরাজীর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এমন বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে সাধারণ মানুষ ‘জনগণের পকেট কাটা’ হিসেবে দেখছেন। টোনেকাবন শহরের বাসিন্দা আলী জানান, এই আয়োজনের খেসারত হিসেবে গত কয়েকদিনেই রুটি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা বনাম শেষকৃত্যে বিলাসিতা: তেহরানের ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের অভিযোগ ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রকৃত জাতীয় দুর্যোগের সময়ে সরকার যখন জরুরি চিকিৎসা, খাবার বা অস্থায়ী আশ্রয় দিতে ব্যর্থ হয়; তখন একজন ‘স্বৈরাচারী’ নেতার শেষকৃত্যে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট, জরুরি ইন্টারনেট ও লজিস্টিকসের নামে বিপুল অর্থ ওড়ানো হচ্ছে।
থমথমে ও অস্বস্তিকর পরিবেশ: পুরো তেহরান জুড়ে নতুন করে তল্লাশি চৌকি বসানো, রাস্তাঘাট বন্ধ রাখা এবং কট্টর রক্ষণশীলদের উপস্থিতিতে একটি থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও নতুন নেতার রহস্য
এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রায় ৩০টির বেশি দেশের নেতা ও প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলেও কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অনুষ্ঠানটি কাভার করতে প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক উপস্থিত থাকছেন।
তবে পুরো আয়োজনে সবচেয়ে বড় রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। গত ফেব্রুয়ারির সেই বিমান হামলায় তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি। এই শেষকৃত্যে তাঁর সশরীরে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি ইরানের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে খামেনির মরদেহ দাফন করা হবে। ইরানের স্পিকার বাঘের গালিবাফ এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে ‘প্রতিশোধের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে জনগণকে বিশাল জনসমাগমের আহ্বান জানিয়েছেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন