এরদোয়ানের নামে ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর নালিশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
এরদোয়ানের নামে ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর নালিশ

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে তিনি তুরস্কের কাছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে যুদ্ধবিমান ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন নেতানিয়াহু। ওই আলাপেই তিনি এরদোয়ানের বক্তব্য এবং তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। চলতি সপ্তাহে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের কথা রয়েছে। এ সময় তার সঙ্গে এরদোয়ানের বৈঠকও হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গাজা ও ইরানকে ঘিরে গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উভয় দেশের সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর সদস্য এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তুরস্ক ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর প্রভাব কিছুটা কমেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও তার রাজনৈতিক জোটের ভেতরেও প্রভাব ফেলেছে। ফলে এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং তুরস্কে সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির অর্থনৈতিক দিকও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সোমবার ট্রাম্প ন্যাটো নেতাদের সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কে যাচ্ছেন। সফরকালে তুরস্কের যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ৭০ কোটি ডলারের নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ এবং দেশটিকে পুনরায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, এস-৪০০ ব্যবস্থার কারণে এফ-৩৫-এর গোপন প্রযুক্তি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে, তা পেন্টাগন খতিয়ে দেখছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

নেতানিয়াহুর মতে, তুরস্কের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় তাদের কাছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর করা উচিত হবে না। তিনি মনে করেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সামরিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্প্রতি এরদোয়ান জায়নবাদকে ‘গণহত্যার মতাদর্শ’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, এটি তুরস্কের জন্যও হুমকি। একই সময়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েল সরকারকে ‘মানবজাতির জন্য অসহনীয় বোঝা’ এবং ‘বিশ্বের জন্য সমস্যা’ বলে মন্তব্য করে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানান।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘সংযত’ হওয়ার বার্তা দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, নেতানিয়াহু তার উদ্বেগ ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরেছেন এবং প্রেসিডেন্ট বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। প্রয়োজনে তিনি এরদোয়ানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন।

যদিও পুরো বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এদিকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নেতানিয়াহু সন্তুষ্ট ছিলেন না। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর দেওয়া বেশ কিছু পূর্বাভাস বাস্তবে মিলেনি। চলতি মাসের শেষ দিকে তার হোয়াইট হাউস সফরের কথা রয়েছে।

এরই মধ্যে সোমবার ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের কঠোর সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন, তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে এমন শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছে, যাদের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

তিনি আরও বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী চরমপন্থী আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত একটি সরকারের হাতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বা এর ইঞ্জিন তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সামরিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বর্তমানে ইসরায়েলের আকাশসামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।

এএন