মার্কিন হামলার জবাবে উপসাগরীয় ৩ দেশে ইরানের পাল্টা আঘাত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
মার্কিন হামলার জবাবে উপসাগরীয় ৩ দেশে ইরানের পাল্টা আঘাত

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে পরিস্থিতি এখন এক অনিয়ন্ত্রিত ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টানা দুই রাতের ব্যাপক ও প্রাণঘাতী বিমান হামলার পর ইরান এবার সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর পাল্টা আঘাত হেনেছে। 

তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তারা বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারে অবস্থিত 'মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে' ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে।

এই চরম সংঘাতের সমান্তরালে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা ও বিমান হামলা এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

কেন হঠাৎ নতুন করে শুরু হলো এই যুদ্ধ?

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নিহত হওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ ৪ মাস রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর একটি সমঝোতা স্মারক বা যুদ্ধবিরতির চুক্তি (MoU) স্বাক্ষরিত হলেও তা স্থায়ী হয়নি।

গত কয়েক দিনে ইরানের দীর্ঘায়িত রাষ্ট্রীয় শোক ও খামেনীর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরানের সাথে সম্পাদিত সেই সমঝোতা চুক্তি বা 'MoU' এখন সম্পূর্ণ 'অকার্যকর ও শেষ'। 

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালী ও ইরানের মূল ভূখণ্ডে 'অতিরিক্ত বিমান হামলা' শুরু করে। ট্রাম্পের সাফ হুঁশিয়ারি ছিল, ইরানকে তারা "আরও কঠিন আঘাত" করবে। এর জবাবে ইরানও মার্কিন রণতরী ও নৌপথ লক্ষ্য করে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়।

ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি ছিল ইতিহাস-সৃষ্টিকারী এক বিশাল ও আবেগঘন আয়োজন, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক গভীর বার্তা দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে তাঁর দাফন স্থগিত রাখা হয়েছিল। 

অবশেষে জুলাই মাসের ৩ তারিখ থেকে শুরু হয়ে আজ ৯ জুলাই পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৭ দিন ধরে ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন পবিত্র শহরে খামেনী এবং তাঁর নিহত চার পরিবারের সদস্যদের কফিন নিয়ে এক নজিরবিহীন শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলাকালেই ইরানের সর্বত্র 'শহীদত্ব ও প্রতিশোধের' প্রতীক লাল পতাকা উড়ানো হয় এবং খামেনীর উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনীকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মার্কিনীদের প্রাণঘাতী হামলা

মার্কিন বিমানবাহিনী টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানের উপকূলীয় শহরগুলো, বিশেষ করে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ধমনী হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালী'র অববাহিকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। গত ৪৮ ঘণ্টার এই হামলায় ইরানের অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি বিস্ফোরণ ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে ইরানের চার প্রধান শহরে:

  • বুশেহর: ইরানের প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সংবেদনশীল স্থাপনার শহর।
  • চাবাহার: ওমান উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত কৌশলগত বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর।
  • বান্দর আব্বাস: পারস্য উপসাগরে ইরানি নৌবাহিনীর প্রধান সদর দফতর।
  • সিরিক: হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত উপকূলীয় সামরিক অঞ্চল।

৩ আরব দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত

আমেরিকার এই ভয়াবহ হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান কোনো সময় নষ্ট করেনি। আজ সকালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) প্রতিবেশী তিন আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ও কৌশলগত ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে।

  • বাহরাইন: এই দ্বীপ রাষ্ট্রে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (US Fifth Fleet)-এর প্রধান সদর দফতর অবস্থিত, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ-শক্তির মূল চালিকাশক্তি।
  • কাতার: কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি (Al Udeid Air Base), যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটি।
  • কুয়েত: যেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীর বিশাল ক্যাম্প ও অগ্রবর্তী রসদ সরবরাহ কেন্দ্র রয়েছে।

ইরানের দাবি, তাদের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো মার্কিনীদের এই কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। তবে ওয়াশিংটন বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে, তা গোপন রাখা হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলিদের নৃশংসতা

ইরান ও আমেরিকার এই সংঘাতের আড়ালে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলা ও গণহত্যা এক নতুন দানবীয় রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি' এবং বেসামরিক মানুষের আশ্রয়ের জন্য নির্ধারিত 'নিরাপদ অঞ্চল' বা 'মানবিক অঞ্চল-এর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরায়েল গাজায় লাশের পাহাড় তৈরি করছে।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার মাঠ পর্যায়ের সংবাদদাতা হিন্দ খুদারির হৃদয়বিদারক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গাজায় প্রতিদিন হামলার তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ইসরায়েলি হামলায় যারা গুরুতর আহত হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। এর একমাত্র এবং ভয়াবহ কারণ হলো গাজার হাসপাতালগুলোতে কোনো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নেই, কোনো ব্যান্ডেজ বা চিকিৎসা সামগ্রী নেই। ডাক্তারদের পক্ষে এই অসহায় আহত মানুষদের বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং স্নাইপারদের নির্বিচারে গুলিতে আরও অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন সাধারণ ট্রাক চালকও রয়েছেন, যিনি দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে ইসরায়েলিদের নির্দেশিত 'সেফ জোন' বা নিরাপদ সড়কের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এছাড়াও, গাজার আল-মাওয়াসি (al-Mawasi) এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একটি শরণার্থী তাঁবুতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে সরাসরি বোমাবর্ষণ করা হয়। এই পৈশাচিক হামলায় তাঁবুর ভেতরে থাকা একটি সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি পরিবার জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং আরও একটি নিষ্পাপ শিশুর নির্মম মৃত্যু ঘটে। 

উল্লেখ্য, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিজেই এই আল-মাওয়াসি এলাকাকে 'মানবিক অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করে লাখ লাখ মানুষকে সেখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু আজ নিজেদের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইসরায়েল সেখানেও গণহত্যা চালাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখে, তবে কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনের মতো রাষ্ট্রগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই যুদ্ধের চোরাবালিতে তলিয়ে যাবে। এই সর্বাত্মক যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতিমধ্যেই এক লাফে আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। 

হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দার কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বন্ধের তীব্র তাগিদ দিলেও, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি একটি অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এএন