ইরানের জাহাজে হামলা

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইউক্রেনের এক সামরিক অভিযানে। কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।

ঘটনাটিকে ‘শত্রুভাবাপন্ন ও অপরাধমূলক’ আখ্যা দিয়ে ইউক্রেনকে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইউক্রেন কি নতুন এক সংঘাতের ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নিল?

সম্প্রতি কাস্পিয়ান সাগরে পরিচালিত এক বিশেষ সামরিক অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে পরিচালিত ওই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযানে রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক কার্গো বহনকারী একটি জাহাজও লক্ষ্যবস্তু ছিল।

ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম এবং লজিস্টিকস পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলোকেই টার্গেট করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করাই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। প্রয়োজন হলে সীমান্তের বাইরে গিয়েও এ ধরনের অভিযান চালাতে ইউক্রেন প্রস্তুত এই বার্তাই তারা দিতে চেয়েছে।

অন্যদিকে, হামলার পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, গত শনিবার (২৫ জুলাই) কাস্পিয়ান সাগরে ড্রোন হামলার ফলে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নাবিক নিহত হন এবং আরেকজন গুরুতর আহত হন। ঘটনার জেরে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইরানের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত ও শত্রুতাপূর্ণ হামলা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করে ঘটনার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পাল্টা ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত।

ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর থেকেই কিয়েভ অভিযোগ করে আসছে, ইরান রাশিয়াকে হাজার হাজার ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করেছে। ইউক্রেনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার ছোড়া ৪৪ হাজারেরও বেশি ইরানি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। তবে ইরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা এই যুদ্ধে কোনো পক্ষকে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে না।

রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের পাল্টা জবাব হিসেবে ইউক্রেনও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতে ইউক্রেন বিশেষায়িত ড্রোন ইন্টারসেপ্টর দল পাঠিয়েছে। এসব দল স্থানীয় বাহিনীকে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করার কৌশল এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে কাস্পিয়ান সাগরে সরাসরি ইরানি জাহাজে হামলাকে অনেকেই ইউক্রেনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধেও নতুন অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, রাশিয়া মহাকাশে থাকা নিজেদের সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছে এবং সেই গোয়েন্দা তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করছে। জেলেনস্কির মতে, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা ও হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে রাশিয়ার দেওয়া স্যাটেলাইট তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এ অভিযোগের মাধ্যমে ইউক্রেন দাবি করছে, মস্কো ও তেহরানের সামরিক সহযোগিতা আগের চেয়ে আরও গভীর হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে রাশিয়া বা ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এই হামলার পর ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইরানের হাতে এমন বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। খুররামশাহর, সিজ্জিল এবং হাজ কাসেম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা প্রায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে ইরান চাইলে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গত মার্চে ইসরায়েলকে সহায়তার অভিযোগ তুলে ইউক্রেনকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ ঘোষণা করেছিল ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলকে ড্রোন সহায়তা দিয়ে ইউক্রেন কার্যত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং এর ফলে নিজেদের ভূখণ্ডকে ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি তেহরান। অন্যদিকে, ইউক্রেনও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে ড্রোন সহায়তার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের দল পাঠানোর বিষয়টি জানা গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন এমনিতেই রাশিয়ার তীব্র সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। এমন বাস্তবতায় ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনা তৈরি করা কৌশলগতভাবে কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার পর ইরান রাশিয়াকে আরও উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করতে পারে, যা ইউক্রেনের অবকাঠামো এবং বেসামরিক জনগণের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগর কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ইউক্রেন বা পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য ইরানি প্রতিক্রিয়ার দিকেও ইউক্রেনকে এখন নজর রাখতে হবে, যা দেশটির সীমিত সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কাস্পিয়ান সাগরের এই হামলা অনেকের মতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ইউক্রেন হয়তো রাশিয়ার সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানার লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করেছে, কিন্তু এর মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ও শুরু হয়েছে। তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি বাস্তবে রূপ নিলে এই ঘটনার প্রভাব কেবল ইউক্রেন-ইরান সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা, তুর্কিয়ে টুডে, শিনহুয়া

এএন