দুই ভিনদেশী নাগরিক স্বামী স্ত্রী আইনি লড়াই চলছে। তবে সে লড়াই কোন অর্থবিত্ত নিয়ে নয়, নিজ সন্তানদের কাছে পেতে এ লড়াই। দুজনেই আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। হাল ছাড়ছেন না কেউই। আদালত সমাঝোতার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই মেয়েদের ফিরে পেতে আদালতে দৌড়ঝাপ করছেন দুজন। বিচারকি আদালত থেকে মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত। কিন্তু তাতে সমাধান হয়নি। হাইকোর্ট দুজনের মাঝে সমোঝতার নির্দেশ দিলেও সেটা প্রতিপালন হয়নি। আদালতের নিষেধাজ্ঞাও মানছেন না কেউ। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরেও গত ২৮ ডিসেম্বর আদালতের নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে জাপান ফেরার চেষ্টা করছিলেন মা নাকানো এরিকো। পরে তাকে আটকে দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। উপায়ান্ত না পেয়ে অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গনে এসে বড় মেয়ে জেসমিন মালিকা জাপান ফিরে যাওয়ার আর্জি জানিয়েছে।
সোমবার (১৬ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
জেসমিন মালিকা বলেন, আমি জাপান যেতে চাই। আমাকে বলা হয়েছিল যে আমরা আমেরিকায় যাবো। কিন্তু আমরা আমেরিকায় যেতে পারবো না। দুই বছর থেকে আমরা এখানে (বাংলাদেশ) আছি। তিনি আরও বলেন, আমাকে ভুল বোঝানো হয়েছিল। আমার মায়ের বিষয়ে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আমি নির্ভরযোগ্য রিসার্চ করেছি। আমি সব জানতে পেরেছি। জাপানে সব কিছু রয়েছে উল্লেখ করে জেসমিন মালিকা বলেন, আমার স্কুল জাপানে, আমার সংস্কৃতি জাপানে, আমার বন্ধুবান্ধব জাপানে, আমার সবকিছু জাপানে। আমি এখানে কীভাবে থাকবো? আমি সেখানে যেতে চাই। এ সময় জেসমিন মালিকার সঙ্গে তার মা এরিকো নাকানো ও তাদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন।
এরিকো নাকানো বলেন, ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট পারিবারিক আদালতকে তিন মাসের মধ্যে মামলাটি শেষ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইমরান বিলম্ব করছেন। এটি প্রায় এক বছর হয়ে গেছে এবং এখনও বিচার চলছে। তাই আমার মা ও তৃতীয় মেয়ে সোনিয়ার সঙ্গে দেখা করা আমার জন্য জরুরি। বাংলাদেশে আমার অবর্তমানে মেয়েদের দেখাশোনার জন্য কেউ নেই। এমতাবস্থায় তাদের সঙ্গে নিয়ে আমার মুমূর্ষু মাকে দেখতে জাপান যেতে চেয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, ইমরান আমার ব্যক্তিগত জীবন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য বেশ কিছু গুপ্তচর নিযুক্ত করেছেন। এমনকি আমরা কাছাকাছি শপিং মলেও যেতে পারি না। বিষয়টি আমি থানা ও পারিবারিক আদালতকে জানালেও তারা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।
ইমরান আমার ড্রাইভার, অনুবাদক, বন্ধু ও আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে। এমনকি সে আমার বাসার রিয়েল এস্টেট ম্যানেজারকেও হুমকি দিয়েছে। ইমরান আদালতের আদেশ অমান্য করছেন উল্লেখ করে এরিকো নাকানো বলেন, ইমরান বেশ কয়েকবার আমাকে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন। ভিসা কর্তৃপক্ষ আমাকে সহযোগিতা করেনি। তারা মূলত আমার ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে এবং অপ্রয়োজনে বিভিন্ন প্রমাণপত্র দেখতে চায়। জাপানি চিকিৎসক নাকানো এরিকোর সঙ্গে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ইমরান শরীফের বিয়ে হয় ২০০৮ সালে। দাম্পত্য কলহের জেরে ২০২০ সালের শুরুতে বিচ্ছেদের আবেদন করেন এরিকো। এরপর ইমরান স্কুলপড়ুয়া বড় দুই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। ছোট মেয়ে জাপানে এরিকোর সঙ্গে থেকে যান।
মেয়েদের জিম্মায় পেতে গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশে আসেন এ জাপানি নারী। তিনি হাইকোর্টে রিট করলে তাদের সমঝোতায় আসতে বলেন বিচারক। তবে ওই দম্পতি সমঝোতায় না আসায় কয়েকমাস ধরে শুনানির পর হাইকোর্ট দুই সন্তানকে বাবার হেফাজতে রাখার সিদ্ধান্ত দেন। পাশাপাশি মা যাতে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বাবাকে খরচ দিতে বলা হয়। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন শিশুদের মা নাকানো এরিকো।
পরে আপিল বিভাগ এক আদেশে শিশু দুটিকে মায়ের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দিলেও বাবা সেটা না মানায় বিচারকরা উষ্মা প্রকাশ করেন। পরে আদালত শিশু দুটিকে বাবার হেফাজত থেকে এনে তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং পরে মায়ের হেফাজতে দেওয়ার আদেশ দেন। এরপর দুই মেয়ে কার জিম্মায় থাকবে, তা নিষ্পত্তি করতে গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পারিবারিক আদালতকে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। তার আগ পর্যন্ত দুই শিশু মায়ের কাছেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এরপর আপিল বিভাগ থেকে মামলাটি পারিবারিক আদালতে যায়।
এদিকে, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর রাতে দুই সন্তান নিয়ে জাপানে যাওয়ার জন্য ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান এরিকো নাকানো। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় তাকে বিমানবন্দর থেকে পুলিশ ফিরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় ২৯ ডিসেম্বর দুই সন্তানের বাবা ইমরান শরিফ ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরাফাতুল রাকিবের আদালতে মামলা করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এবি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন