মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাসের ফলে মানুষ সম্পদ অর্জন করে, পরিবার গঠন করে এবং মৃত্যুর পর সেই সম্পদের মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই জটিলতা নিরসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে উত্তরাধিকার আইন। সহজভাবে বলতে গেলে, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কে বা কারা, কীভাবে এবং কতটুকু অংশে পাবে, তা নির্ধারণ করার আইনই হলো উত্তরাধিকার আইন।
উত্তরাধিকার আইন হলো সেই আইনসমষ্টি, যার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তার আইনগত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় যদি কোনো উইল বা ওসিয়ত করে যান, তাহলে সেই দলিল অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন হয়। আর যদি উইল না থাকে, তাহলে প্রচলিত আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুসারে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়।
উত্তরাধিকার আইন না থাকলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সম্পত্তি নিয়ে সংঘাত বেড়ে যেত। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ন্যায্যভাবে বণ্টন নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকারীদের অধিকার সংরক্ষণ করা, পরিবার ও সমাজে শান্তি বজায় রাখা এবং আইনি জটিলতা ও বিরোধ হ্রাস করা। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ একটি বড় সামাজিক সমস্যা। উত্তরাধিকার আইন এই সমস্যার একটি কাঠামোগত সমাধান দেয়।
উত্তরাধিকার আইন সাধারণত দুইভাবে কার্যকর হয়। প্রথমত, উইলভিত্তিক উত্তরাধিকার। যখন কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তি কীভাবে বণ্টিত হবে সে বিষয়ে লিখিত দলিল করে যান, তাকে উইল বলা হয়। উইলের মাধ্যমে ব্যক্তি তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে নির্ধারণ করতে পারেন। তবে অনেক দেশে উইলের ক্ষেত্রেও কিছু আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকে, বিশেষ করে ধর্মীয় বিধান অনুসারে। দ্বিতীয়ত, আইনভিত্তিক উত্তরাধিকার। যখন কোনো ব্যক্তি কোনো উইল না রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন বা ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন হয়। একে বলা হয় আইনভিত্তিক বা ইনটেস্টেট উত্তরাধিকার।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন মূলত ধর্মভিত্তিক। এখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক উত্তরাধিকার বিধান প্রচলিত রয়েছে। মুসলিমদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় ইসলামি শরিয়াহ আইনের আলোকে। এখানে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার বণ্টন হয়। পুত্র, কন্যা, স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা, সকলের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারিত আছে। সাধারণভাবে বলা হয়, পুত্র কন্যার দ্বিগুণ অংশ পায়, তবে এর পেছনে আর্থিক দায়িত্ব ও সামাজিক কাঠামোর যুক্তি রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন প্রধানত প্রথাগত ও শাস্ত্রনির্ভর। পিতৃসম্পত্তিতে পুত্রদের অধিকার ঐতিহাসিকভাবে বেশি হলেও সাম্প্রতিক আইনি সংস্কারের ফলে কন্যার অধিকার কিছুটা সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার অধিকার নিয়ে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় উত্তরাধিকার আইন ও দেওয়ানি আইনের মাধ্যমে। এখানে স্ত্রী ও সন্তানরা তুলনামূলকভাবে সমানাধিকার পেয়ে থাকে।
উত্তরাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর অধিকার। অনেক সমাজে নারী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত বা অবহেলিত হয়ে থাকে। যদিও আইনে তাদের অধিকার স্বীকৃত, বাস্তবে সামাজিক চাপ, অজ্ঞতা ও প্রভাবশালী পক্ষের কারণে নারীরা প্রায়ই তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন। এই ক্ষেত্রে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধ খুবই সাধারণ ঘটনা। জাল দলিল, ভুয়া ওয়ারিশ সনদ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দীর্ঘসূত্রতা, এসব কারণে মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। ফলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয় এবং পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। তাই উত্তরাধিকার আইন কার্যকর করতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নৈতিকতা অপরিহার্য।
সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেকেই জানেন না তাদের আইনগত অধিকার কী, কিংবা কীভাবে তা দাবি করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। উত্তরাধিকার আইন শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি। সঠিক ও ন্যায্য উত্তরাধিকার বণ্টন পরিবারে শান্তি বজায় রাখে এবং সমাজকে স্থিতিশীল করে। তাই উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, আইন মানা এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা গ্রহণ করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে উত্তরাধিকার আইনের সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন