বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহ বা দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের একটি রায়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে আইনি বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি কেবল স্ত্রীর সম্মতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এখানে রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বহুবিবাহের বিধান এবং এর প্রক্রিয়া বর্ণিত আছে। এই ধারাটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।
আবেদনকারীর প্রধান যুক্তি ছিল যে, বিদ্যমান আইনে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হলেও স্ত্রীদের প্রতি সম অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর নীতিমালা নেই। বর্তমানে সালিস পরিষদ বা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে অনুমতি নেওয়ার যে বিধান রয়েছে, সেখানে নারীর সাংবিধানিক অধিকার পুরোপুরি সংরক্ষিত হয় না। বিশেষ করে স্বামী মানসিকভাবে বা আর্থিকভাবে দ্বিতীয় বিয়ের যোগ্য কি না এবং প্রথম স্ত্রীর খোরপোশ নিশ্চিত হবে কি না, তা যাচাই করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা এই কাউন্সিলের নেই।
রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছিলেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছিল, স্ত্রীদের সম অধিকার নিশ্চিত না করে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার বর্তমান প্রক্রিয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট সেই রুলটি ডিসচার্জ বা খারিজ করে দেন। গত ডিসেম্বর মাসে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেন, ১৯৬১ সালের আইনের ৬ছ ধারাটি কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়। এই আইনটি নারী বা পুরুষ কোনো পক্ষেরই মৌলিক অধিকার খর্ব করে না। সালিস পরিষদ কোনো পক্ষের ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না এবং বিদ্যমান প্রক্রিয়াটি বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণে একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের বিধানটিই বহাল থাকল।
আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিস পরিষদের লিখিত পূর্বানুমতি নিতে হবে। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং সেই আবেদনে দ্বিতীয় বিয়ের কারণ ও বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে।
আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান স্বামী এবং স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। এই প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সালিস পরিষদ যদি মনে করে প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত, তবেই তারা অনুমতি দিতে পারেন। সালিস পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন, যার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
যদি কোনো ব্যক্তি সালিস পরিষদের অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তাকে গুরুতর আইনি পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। আইনের ৬ (৫) ধারা অনুযায়ী বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের পাওনা সম্পূর্ণ দেনমোহর, তৎক্ষণাৎ ও স্থগিত উভয়ই, স্বামী তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। পরিশোধ না করলে তা ভূমি রাজস্ব বকেয়ার মতো কঠোরভাবে আদায়যোগ্য হবে। এছাড়া বিনা অনুমতিতে বিয়ের অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অনেকের ধারণা ছিল কেবল প্রথম স্ত্রীর মৌখিক বা লিখিত সম্মতি থাকলেই স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন।
আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, বিষয়টি আসলে তা নয়। আইনের কোথাও বলা নেই যে কেবল স্ত্রীর অনুমতি পেলেই বিয়ে বৈধ হবে। আইন বলছে, অনুমতি দিতে হবে সালিস পরিষদকে। সালিস পরিষদ শুনানির সময় স্ত্রীর বক্তব্য গ্রহণ করবে, কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা কাউন্সিলের হাতে।
হাইকোর্টের রায়ের পর এটি নিশ্চিত হলো যে, বহুবিবাহের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা সালিস পরিষদের মধ্যস্থতার যে পুরনো আইন ছিল, তা বদলাচ্ছে না। অর্থাৎ স্ত্রীর সম্মতির চেয়েও আরবিট্রেশন কাউন্সিলের আইনি অনুমোদন পাওয়া এখানে মুখ্য। রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন, তাঁরা এই রায়ে সন্তুষ্ট নন। কারণ সালিস পরিষদের চেয়ারম্যান অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন এবং স্ত্রীদের সম অধিকার নিশ্চিত করার মতো গভীর সক্ষমতা এই পরিষদের নেই।
এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা খুব শীঘ্রই আপিল বিভাগে আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে নতুন কোনো নিয়ম তৈরি হয়নি, বরং ১৯৬১ সালের বিদ্যমান আইনটিকেই বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে এখনো আইনি নিয়ম মেনে সালিস পরিষদের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক এবং এই অনুমতি ব্যতিরেকে করা বিয়ে আইনিভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন