দেশের আর্থিক খাতের দুই আলোচিত নাম এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক শীর্ষ কর্তা প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার এখন কাঠগড়ায়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে সাড়ে ৩২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার দুপুরে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক মো. আবদুস সালাম আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠনের এই আদেশ প্রদান করেন। এর মাধ্যমে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের পথ সুগম হলো।
দুদকের তদন্ত এবং আদালতের অভিযোগনামা থেকে জানা যায়, জালিয়াতির এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৩ সালে। তৎকালীন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের (বর্তমানে আভিভা ফাইন্যান্স) কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ‘মেসার্স মোস্তফা অ্যান্ড কোং’ নামক একটি নামসর্বস্ব বা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি মেয়াদি ঋণ অনুমোদন করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর এই বিশাল অঙ্কের টাকা বিতরণ করা হলেও তা ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হয়নি। বরং আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সেই অর্থ অন্যত্র স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরের ১৬ অক্টোবর দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন।
এই মামলায় প্রধান আসামিদের মধ্যে রয়েছেন এস আলম গ্রুপ এবং তৎকালীন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ:
এস আলম গ্রুপ: গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসান এবং শাহানা ফেরদৌস।
রিলায়েন্স ফাইন্যান্স: সাবেক এমডি পি কে হালদার, সাবেক ইভিপি রাশেদুল হক, সাবেক ম্যানেজার নাহিদা রুনাই, সাবেক এসভিপি কাজী আহমেদ জামাল এবং সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার জুমারাতুল বান্না।
অন্যান্য: মাররিন ভেজিটেবল অয়েলসের সাবেক এমডি জহির আহমেদ এবং তিনজন পরিচালক—টিপু সুলতান, মো. ইসহাক ও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।
উল্লেখ্য, অভিযুক্তদের মধ্যে নাহিদা রুনাই এবং রাশেদুল হক বর্তমানে কারাগারে আছেন। মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং পি কে হালদারসহ বাকি আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন।
আজ শুনানির সময় কারাগারে থাকা দুই আসামি নাহিদা রুনাই ও রাশেদুল হককে আদালতে উপস্থিত করা হয়। তাদের আইনজীবীরা মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানালেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। চার্জ গঠনের সময় দুই আসামিই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতেই তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুদকের আইনজীবী মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ থাকায় আদালত চার্জ গঠন করেছেন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
গত ১১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেছিলেন। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য বিশেষ জজ আদালত-৯-এ পাঠানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এস আলম এবং পি কে হালদারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হওয়া দেশের ভঙ্গুর আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। বিশেষ করে পলাতক থাকা অবস্থায় এস আলমের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হওয়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সাড়ে ৩২ কোটি টাকার এই মামলাটি পি কে হালদারের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের মহাসমুদ্রে একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তবে এস আলম গ্রুপের কর্ণধারের সাথে তার যোগসাজশ প্রমাণিত হলে তা দেশের ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিগুলোতে সংঘটিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক ভয়ংকর চিত্র উন্মোচন করবে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে এই জালিয়াতির আরও গভীর গোপন তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন