জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম প্রদীপ্ত শিখা, শহীদ আবু সাঈদ হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত সমাগত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ মঙ্গলবার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছেন, যেকোনো দিন এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদের রক্তঋণ শোধের আইনি প্রক্রিয়া পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটররা আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং এর পেছনে থাকা পরিকল্পিত নির্দেশনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই মামলাটি প্রমাণ করার জন্য তারা মোট ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ও দালিলিক প্রমাণাদি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি দেখান যে, আবু সাঈদ নিরস্ত্র অবস্থায় দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ যেভাবে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালিয়েছে, তা স্পষ্টতই একটি ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই অপরাধে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি যারা নেপথ্যে থেকে উসকানি ও নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরও সর্বোচ্চ শাস্তির জোর দাবি জানানো হয়েছে।
এই মামলায় মোট ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন:
প্রধান আসামিদের মধ্যে: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য (ভিসি) হাসিবুর রহমানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কতিপয় কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য।
গ্রেপ্তার পরিস্থিতি: অভিযুক্ত ৩০ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। বাকি ২৪ জন পলাতক রয়েছেন। আদালত পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
বিপরীত দিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চেয়েছেন। তাদের দাবি, এজাহারে উল্লিখিত অনেক তথ্যই অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে রাষ্ট্রপক্ষ পাল্টা যুক্তিতে বলেছে, আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য সারা বিশ্বের সামনে উন্মোচিত, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার সেই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়। আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। শহীদ আবু সাঈদ পরিণত হন এক অপরাজেয় সাহসের প্রতীকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর এই রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ, বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের পরিবার এবং জুলাই আন্দোলনের কর্মীরা। ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখায় এখন যেকোনো দিন আদালত ভবন চত্বরে বেজে উঠতে পারে ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত ঘণ্টা।
আইনজীবীরা মনে করছেন, এই মামলার রায় পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির বা ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে কাজ করবে।
শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের এই বিচারিক সংবাদটি আমি নির্ভুলভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছি।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন