চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি ত্রুটি নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বখ্যাত বন্দর পরিচালক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড (DP World)-এর সঙ্গে সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।
নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে আইনি জটিলতা বেশ দীর্ঘদিনের। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এই রিটের ওপর বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন।
দ্বৈত বেঞ্চের অবস্থান: একজন বিচারপতি এই চুক্তি প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করলেও অন্যজন এটিকে বৈধ বলে মত দেন।
প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ: নিয়ম অনুযায়ী, দ্বৈত বেঞ্চে ভিন্নমত দেখা দেওয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি মামলাটি বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান।
চূড়ান্ত রায়: দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ বিচারপতি জাফর আহমেদ সরকারের গৃহীত এই চুক্তি প্রক্রিয়াকে আইনসম্মত ও বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রিটটি খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে দেন।
২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে এনসিটি পরিচালনার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। গত বছর এই চুক্তির প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।
রিটে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া সরাসরি একটি বিদেশি কোম্পানিকে টার্মিনাল লিজ দেওয়া দেশের প্রচলিত আইন ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। তবে আদালত আজ স্পষ্ট করেছেন যে, জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) ভিত্তিতে এবং পিপিপি আইনের আওতায় এই ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার সরকারের রয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বন্দরের আধুনিকায়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বিদেশি কারিগরি জ্ঞান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হলে তা সামগ্রিক বাণিজ্যেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির ফলে বন্দরে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন হবে এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার মাধ্যমে বন্দরের বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে চায়।
উল্লেখ্য যে, এই টার্মিনাল বিদেশি হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করে আগে থেকেই স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন ও কিছু রাজনৈতিক পক্ষ আন্দোলন করে আসছিল। তাদের দাবি ছিল, নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই এই টার্মিনাল চালানো সম্ভব। তবে হাইকোর্টের আজকের রায়ের পর সেই বিতর্কের আইনি অবসান ঘটল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
হাইকোর্টের এই রায়ের কপি পাওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চূড়ান্ত হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে রিটকারী পক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়ে এখন আইনি মহলে আলোচনা চলছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন