অ্যাটর্নি জেনারেল

রামিসাসহ সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার শুনানি বিরতিহীনভাবে চলবে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম
রামিসাসহ সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার শুনানি বিরতিহীনভাবে চলবে
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী অধ্যায়। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ স্পর্শকাতর ও জঘন্যতম সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান নিয়েছে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ। এখন থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এই ধরনের মামলার বিচারিক কার্যক্রম কোনো ধরনের বিরতি, দীর্ঘসূত্রতা বা স্থবিরতা ছাড়াই একটানা ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এই ঐতিহাসিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ এবং ঝুলে থাকা মামলার জট নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর বার্তা দেওয়া হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সামাজিক ব্যাধি ও জঘন্য অপরাধের বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ একযোগে ও সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) এবং আসামিপক্ষের করা আপিল মামলাগুলো হাইকোর্টে এসে ঝুলে থাকার কারণে অপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই প্রাতিষ্ঠানিক জট কাটিয়ে উঠে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই এই বিশেষ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, আমরা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা ও অপেক্ষা আর বাড়াতে চাই না। রাষ্ট্রপক্ষ এবং আদালত এখন থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই স্পর্শকাতর মামলাগুলোর দ্রুত ও নিখুঁত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করবে।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল একটি বিশেষ ঘোষণা দিয়ে জানান, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁত ও জোরালোভাবে পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের সবচেয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি 'বিশেষ আইনজীবী প্যানেল'গঠন করা হয়েছে।

মামলাটির সংবেদনশীলতা এবং আসামিপক্ষের যেকোনো সম্ভাব্য আইনি মারপ্যাঁচ বা ফাঁকফোকর বন্ধ করতে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। সেই ধারাবাহিকতায় অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই এই মামলার ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল শুনানিতে সশরীরে আদালতে উপস্থিত থাকবেন। তিনি নিজেই রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে সওয়াল-জওয়াব ও যুক্তিতর্ক পরিচালনা করবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার সশরীরে শুনানিতে অংশ নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতিকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে, যা ভুক্তভোগী রামিসার পরিবারকে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায়বিচার এনে দিতে সক্ষম হবে।

হাইকোর্টে মামলার জট দূরীকরণে এবং বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের অভিভাবক, প্রধান বিচারপতি এক অনন্য ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। গতকাল বুধবার (১০ জুন) তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতাধীন মামলাসমূহের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড বা বিশেষ দ্বৈত বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও কার্যতালিকা অনুযায়ী, আগামী রোববার (১৪ জুন, ২০২৬) থেকে এই বিশেষ বেঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। 

এই ডেডিকেটেড দ্বৈত বেঞ্চ আগামী সপ্তাহ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ধরনের জঘন্য অপরাধের মামলাগুলো কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা অপ্রয়োজনীয় মুলতবি ছাড়া প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে শুনবেন এবং নিষ্পত্তি করবেন। এর ফলে অন্যান্য নিয়মিত মামলার চাপে এই স্পর্শকাতর মামলাগুলো আর চাপা পড়ে থাকবে না।

বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বা জেলা জজ আদালত) কোনো আসামির ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হওয়ার পর, আইনগতভাবে সেই রায়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মামলাটি 'ডেথ রেফারেন্স' আকারে হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। একই সাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরাও নিজেদের খালাস বা সাজা কমানোর আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন।

কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, হাইকোর্টে অপর্যাপ্ত বেঞ্চ এবং নিয়মিত দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিপুল পাহাড়সম চাপের কারণে বছরের পর বছর ধরে এই ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি ঝুলে থাকে। ফলশ্রুতিতে, নিম্ন আদালতে অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার পরও এবং সর্বোচ্চ সাজা ঘোষণার পরও বছরের পর বছর ধরে চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হয় না। এটি পরোক্ষভাবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে এক দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়, যা অনেক সময় সমাজকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আজ সংবাদ সম্মেলনে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন গঠিত এই বিশেষ ডেডিকেটেড বেঞ্চ এবং রাষ্ট্রপক্ষের বিরতিহীন শুনানির অনড় সিদ্ধান্তের ফলে এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ও আইনি স্থবিরতা পুরোপুরি কেটে যাবে। রামিসা হত্যা মামলার মতো অন্য সব নারী ও শিশু নির্যাতন এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিদিনের কার্য তালিকায় (কজ লিস্ট) শীর্ষে আসবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

মানবাধিকার কর্মী, আইন শিক্ষাবিদ এবং সাধারণ আইনজীবী মহল সরকারের এবং সুপ্রিম কোর্টের এই সমন্বয়ধর্মী ও কঠোর ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অপরাধ বিজ্ঞানীদের  মতে, সমাজে অপরাধ দমনের সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী হাতিয়ার হলো কেবল কঠোর আইন নয়, বরং শাস্তির দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বাস্তবায়ন। একটি নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর যদি বছরের পর বছর ধরে তার বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে, তবে তা অপরাধিদের মনে আইনের প্রতি ভয় কমিয়ে দেয় এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করে।

আজকের এই যৌথ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও দেশের বিচার বিভাগ যৌথভাবে অপরাধী চক্রের কাছে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা প্রেরণ করল- নারী ও শিশুদের ওপর যেকোনো ধরনের নৃশংসতা, ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের বিচার এ দেশে আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ধামাচাপা পড়বে না বা দীর্ঘায়িত হবে না।

দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, রামিসা হত্যা মামলার মতো একটি বহুল আলোচিত মামলার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও ভরসা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। 

দেশের মানুষ আইনি সুশাসনের এক নতুন আলো দেখতে পাবে। আগামী রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশেষ বেঞ্চের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রপক্ষের ভূমিকার দিকে এখন গভীর আগ্রহ ও প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকবে পুরো দেশ।

এএন