যেসব লক্ষণ দেখলে মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম
যেসব লক্ষণ দেখলে মেয়েশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে

শৈশবের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ২৮ বছর বয়সী মালিহা (ছদ্মনাম) জানান, তখন তিনি গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন। তাঁদের চারপাশের ঘরগুলোতে সব আত্মীয়রাই থাকতেন। একদিন দুপুরে এক কাজিন তাঁকে ঘরে ডাকলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই যান। সেখানে অন্য কেউ না থাকার সুযোগে আকস্মিক তাঁর মুখ চেপে ধরা হয়। মালিহা বলেন, “আমি তখন চিৎকার করতে পারছিলাম না, কাউকে ডাকতেও পারছিলাম না। বড় হয়ে বুঝেছি, এটিকেই বলে যৌন নির্যাতন।”

মালিহার মতো এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা অনেকেই প্রকাশ করেন না। তবে শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার একটি বড় অংশই ঘটে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে, যাদের মধ্যে আত্মীয় বা প্রতিবেশীও থাকতে পারেন। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে এক প্রতিবেশীর হাতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

চেনা মানুষই যখন বড় ঝুঁকি: মিরপুরের ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ওই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে পাশের ফ্ল্যাটের টয়লেটে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। অপরাধ গোপন করতে লাশ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা চালানো হলেও মায়ের তৎপরতায় তা সফল হয়নি এবং অভিযুক্ত জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, কারণ জড়িত ব্যক্তিটি ছিল তাদের প্রতিবেশী।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিতদের দ্বারা শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরএআইএনএন’ সংস্থার গবেষণা বলছে, সেখানেও ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুর পরিচিত থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীনের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী অপরিচিত ছিল, বাকি ৪২ শতাংশ পরিচিত এবং ৩৩ শতাংশ ছিল শিশু আত্মীয়। মূলত অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই এই অপরাধগুলো করা হয়।

দীর্ঘমেয়াদী মানসিক প্রভাব: শৈশবের সেই ট্রমা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় মালিহাকে। তিনি জানান, ভয়ে তখন কাউকে কিছু বলতে না পারায় পরবর্তীতে তাঁর আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং সামাজিক জীবনে এক ধরণের হীনমন্যতা তৈরি হয়।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার জানান, এমন ঘটনার ফলে শিশুদের মাঝে বিষণ্ণতা, চরম উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ এবং পড়াশোনায় অমনোযোগিতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া শারীরিক কিছু লক্ষণ যেমন- ঘুমের মধ্যে কেঁপে ওঠা, অনিদ্রা, মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও প্রকাশ পেতে পারে। এর ফলে পুরুষের প্রতি বা সামগ্রিকভাবে মানুষের প্রতি শিশুর এক ধরণের দীর্ঘস্থায়ী ভীতি তৈরি হয়।

অভিভাবকদের জন্য জরুরি করণীয়: ডা. মেখলা সরকারের মতে, শিশুদের আচরণের আকস্মিক পরিবর্তনকে বাবা-মায়ের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এবং কোনো চাপ না দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিং নেওয়া উচিত।

তিনি আরও পরামর্শ দেন, ৩-৪ বছর বয়স থেকেই শিশুকে ‘গুড টাচ ও ব্যাড টাচ’ (স্পর্শের ভালো-মন্দ) সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। প্রাইভেট পার্টস বা ব্যক্তিগত অঙ্গসমূহ অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না- এই বিষয়টি শিশুকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ‘না’ বলা এবং সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে সেখান থেকে সরে আসার শিক্ষা দিতে হবে। কর্মজীবী অভিভাবকদের ক্ষেত্রে বাসায় সিসি ক্যামেরা ব্যবহার এবং গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ার সময়ও নজরদারি বজায় রাখার ওপর জোর দেন তিনি।

আইন ও এর বাস্তবায়নের সংকট: বাংলাদেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ অনুযায়ী, ধর্ষণের ফলে শিশু বা নারীর মৃত্যু ঘটলে অপরাধীর জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একই কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

তবে মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, “আইনে সমস্যা নেই, সংকট এর বাস্তবায়নে।” ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করার নিয়ম থাকলেও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও চার্জশিটের ফাঁকফোকরের কারণে বিচার ঝুলে থাকে। অনেক সময় লোকলজ্জা বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার ভয়ে পরিবার নিজেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

অ্যাডভোকেট সালমা আলীও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের জন্য ঘরে-বাইরে সবখানেই ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া আমাদের থানাগুলোতে এখনও পুরোপুরি নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশু নির্যাতন রোধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আদালত এবং অপরাধীদের দৃশ্যমান শাস্তি হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সমন্বিত সচেতনতাই পারে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেএইচআর