"সুবোধ" মূলত কলকাতার জনপ্রিয় লেখক অনিমেষ আইচ-এর সৃষ্ট একটি কাল্পনিক চরিত্র, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতির মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পায়। সুবোধ আসলে কোন নাম নয় 'সু' আর 'বোধ' থেকে সৃষ্টি এই সুবোধ। সুবোধ কোন ব্যক্তি নয়, সুবোধ সমাজের একবাস্তব চিত্রের নাম।
২০১৭ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ের দেয়ালে এক শীর্ণকায় যুবক, হাতে বন্দি সূর্য আর চোখেমুখে একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রথম দেখা দিয়েছিল। তার পাশে লেখা ছিল এক রহস্যময় আর্তনাদ "সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না"। আট বছর পেরিয়ে ২০২৫ সালের শেষভাগেও সুবোধ এখনো প্রাসঙ্গিক, তবে এবার তার রূপ ও বার্তা বদলেছে।
সুবোধের উত্থান
২০১৭ সালের মে-জুন মাসে ঢাকার আগারগাঁও ও মিরপুর এলাকায় গ্রাফিতিগুলোর মাধ্যমে সুবোধের যাত্রা শুরু হয়। শিল্পী গোষ্ঠী 'হবেকি?' (HOBEKI?)-এর সুনিপুণ তুলিতে আঁকা এই চরিত্রটি দ্রুতই নাগরিক জীবনের এক বিষণ্ন প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সময়ে একে বর্ণনা করা হয়েছিল সমাজের অবক্ষয় ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে। সুবোধ প্রকাশিত হওয়ার আগের বছরগুলোয় রাষ্ট্র চেপে ধরেছিল সংবাদমাধ্যমের টুঁটি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও মানুষ কথা বলে পার পেত না। রাতের বেলায় মানুষকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হতো, বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও সে আর ঘরে ফিরত না। শিশুরা কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ত, সকাল হলে আবার কান্না শুরু করত। এমন সময়ে দেখা মিলল সুবোধের, সরকারের টিকটিকি বাহিনী ঘাম ছুটিয়েও শিল্পীকে খুঁজে পেত না। সুবোধ একটি গ্রাফিতি, যাকে বলা হয় পাবলিক আর্ট, যা কথা বলে অসংগতির বিরুদ্ধে, যা কোনো অনুমতির তোয়াক্কা করে না। সাধারণ মানুষ দেখতে পায় এমন কোনো জায়গায় গ্রাফিতি প্রকাশিত হয়। তবে বেশি সময় এগুলোর টিকে থাকার সুযোগ হয় না হয় প্রতিপক্ষ মুছে দেয়, অথবা পোস্টার-ব্যানারে ঢেকে যায়।
এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ৭ বছর। সবাই ধরেই নিয়েছিলো সুবোধ হয়তো জেলে নতুবা ফ্যাসিস্ট সরকার তাকে গুম করে ফেলেছে। ২০২৪ সালে সবাইকে অবাক করে জানান দিয়েছিলো সুবোধ হারাননি সুবোধ ফিরে এসেছে। দীর্ঘ সময় অন্তরালে থাকার পর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সুবোধ পুনরায় ফিরে আসে। তবে এবার আর পালিয়ে যাওয়ার সুর নয়, বরং দেয়ালে দেখা যায়- সুবোধ তুই আর পালাস না, থেকে যা আজীবন। আগস্ট বিজয় দিনকয় আগে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও মেট্রোস্টেশনের স্তম্ভগুলোতে সুবোধকে নতুন রূপে চিত্রিত করা হয়, যা বিজয়ী প্রজন্মের সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে । যেখানে সুবোধকে দেখা যায় মাথায় মুকুট পড়ে চেয়ারকে লাত্থি মেরে গুড়িয়ে দিচ্ছে৷
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের দিন ঢাকার আগারগাঁওয়ে সুবোধের নতুন একটি গ্রাফিতি সবার নজর কাড়ে। এখানে সুবোধকে দেখা গেছে এক ভিন্ন আঙ্গিকে হাতে রাইফেলের পরিবর্তে তুলি ও স্প্রে ক্যান। সে এক ছোট্ট মেয়েকে (যে বাংলাদেশের পতাকা হাতে ধরে আছে) আদর করছে, আর তার নিজের মাথায় থাকা সামরিক টুপিটি পরম মমতায় শিশুটির মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে । বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সুবোধ এখন আর ভীত নয়, বরং সে এখন 'আর্ট অব প্রোটেস্ট' বা সৃজনশীল প্রতিবাদের এক সাহসী কারিগর। "গান নয়, বন্দুক নয় শেষ কথা বলবে ভালোবাসা।”
আট বছর আগে যে সুবোধকে পালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল, ২০২৬-এর শুরুতে এসে দেখা যাচ্ছে সেই সুবোধই এখন এদেশের দেয়ালচিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদী চরিত্র। আগারগাঁও থেকে শুরু হওয়া তার এই যাত্রা এখন কেবল ছবি নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন