সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, শিক্ষা অগ্রাধিকারের বাইরে চলে গেছে। কিছু সিদ্ধান্ত এবং কিছু কাজ করা হলেও তা সাধারণ মানুষের কাজে আসবে না।
সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য’ সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, "আমরা শুধু পুনর্গঠন চাইছি না, আমরা চাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে রূপান্তর। রূপান্তর শুধু বই ছাপানো বা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করলেই আসবে না। শিক্ষার্থীদের নীতিনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীকে শুধুই পরীক্ষার্থী বানানো যাবে না।"
সংলাপে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস-এর সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ, বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম সহ আরও অনেকে।
সঞ্চালনা করেন সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান, যিনি বলেন, “বর্তমানে দেশে সংস্কার একটি বহুল আলোচিত বিষয়, কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক চাহিদার দিকে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি। দেশের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”
ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, “গত ১৩ মাস ধরে শিক্ষা নিয়ে দেশে কেউ কথা বলছে না। কোভিডের সময়ে অটোপাস দেওয়ায় শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেছে। নিরীক্ষককে নাম্বার বাড়ানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই অনিয়মগুলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি।”
ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, “বর্তমান সরকার একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশনের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি হলে স্বাস্থ্য সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো স্বতন্ত্রভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে রোগীদের পা রাখার জায়গা নেই। উপজেলা লেভেলের হাসপাতালগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।”
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, “গ্রামে মেডিকেল কলেজ হলেও অবকাঠামো নেই। কোটি টাকার সরঞ্জাম অব্যবহৃত। অনেক জায়গায় অপারেশনের সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না।”
ডা. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট নির্বাচনে এমন শিক্ষক পাওয়া যায়নি যারা অন্য রাজনৈতিক প্লাটফর্মকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। শিক্ষক নির্বাচনই ভীতু হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কল্পনাই করা যায় না।”
ডা. তাসনিম জারা বলেন, “দেশে মেডিকেল ইমার্জেন্সির পরিষেবা সুনিশ্চিত নয়। হেলথ রেকর্ড ডিজিটাল হলে রোগীর পুরনো তথ্য সহজে পাওয়া যাবে, খরচও কমবে। বায়োব্যাংক ও কস্ট-কাটিংকেও অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।”
জোনায়েদ সাকি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসম্মত জায়গায় নিতে হলে বরকন্দাজি প্রশাসন ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বদলাতে হবে। জাতীয় কনসেনসাস ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
ডা. মামুন আহমেদ বলেন, “গত ১৪-১৫ বছরে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে শিক্ষিত মানুষ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। আমরা দক্ষ মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু নীতিনিষ্ঠ মানুষ তৈরি করতে পারছি না।”
মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষা ও স্বাস্থ্য হিউম্যান ক্যাপিটাল তৈরির গুরুত্বপূর্ণ খাত। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় আমাদের দেশে এ দুটি খাত সবচেয়ে অবহেলিত।”
ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, “জনস্বাস্থ্য মানেই আমরা শুধু বিশেষায়িত হাসপাতাল চাই। ৮৫% ইমুনাইজেশন কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও মাতৃ-মৃত্যু ও শিশুমৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।”
ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, “আমরা জিপিএ উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছি, মানুষ তৈরিতে নয়। এর ফলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ঘটছে।”
গোলাম সারোয়ার মিলন বলেন, “শুধু উচ্চশিক্ষিত মানুষ তৈরি করা হচ্ছে, কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার।”
অধ্যাপক ড. শওকত আরা হোসাইন বলেন, “বাংলাদেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে—বাংলা মিডিয়াম, ইংরেজি মিডিয়াম ও মাদ্রাসা। সবকিছুই মানসম্মত হতে হবে।”
ড. সরদার এ. নাঈম বলেন, “চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর চর্চা বন্ধ করতে হবে। দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।”
ডা. ডি কে শিল অর্পণ বলেন, “ইনফেকশন কন্ট্রোল বড় সমস্যা। রোগীরা বেড না পেয়ে ফ্লোর বা বারান্দায় অবস্থান করছে। এতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার হচ্ছে এবং প্রতিদিন জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।”
ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, “স্বাস্থ্য খাতের বাজেট ৫% হওয়া উচিত, কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয় তার অর্ধেক। বাজেট বাস্তবায়ন না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
সংলাপ শেষে উপস্থিত সবাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের তাগিদ দেন এবং নীতিনিষ্ঠ, দক্ষ ও মানবিক মানুষ তৈরির জন্য জোরদার পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন